রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্রমাগত কমবে : আতিউর রহমান

 In ব্যবসা বাণিজ্য, সফল মানুষ

 

এ বছরের ২৮ আগস্ট সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক রূপালী ব্যাংকে যোগদান করেন আতিউর রহমান প্রধান। এর আগে তিনি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। ২০১২ সালের ১১এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ৮মে পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বেও ছিলেন আতিউর রহমান।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটি (এফসিএ) রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা (৩৩ লাখ পাউন্ড) জরিমানা করেছে। একইসঙ্গে সোনালী ব্যাংক ইউকের শাখাগুলোকে নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ থেকে ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য শাখায় কর্মরত সোনালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমান রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিউর রহমান প্রধানের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় অংশগ্রহণ করেন।

এ সময় তিনি দেশের বর্তমান ব্যাংকিং অবস্থা, অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা, ব্যাংকিং খাতে হ্যাকিং ও তার প্রতিকার, রূপালী ব্যাংকের ব্যবসায়িক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। আজ তার আলাপচারিতার দ্বিতীয় পর্ব পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  ফররুখ বাবু ও জাহিদ সুজন। সাক্ষাৎকারের ছবি তুলেছেন ওসমান গনি।

রেমিট্যান্স প্রবাহে সামান্য স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য কি করা উচিত?

রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের তুলনায় খুব একটা কমেনি। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সোনালী ব্যাংকের ইউকে শাখায় থাকাকালীন সময় আমার অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, তবে বলব রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্রমাগত কমবে। কারণ, এখন যুক্তরাজ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের বাংলাদেশিরা বসবাস করে। যারা আমাদের এখান থেকে প্রথম গিয়েছে তারা সেখানে স্থায়ী হয়েছে, তারপর তার ভাইদের নিয়ে গেছে। তখন তাদের দেশের প্রতি টান ছিল। তারা সেখানে গেছে আয় করেছে টাকা দেশে পাঠিয়েছে। তারপর ওদের বাচ্চা-কাচ্চারা যখন ওই দেশে লেখাপড়া করেছে, তখন কিন্তু তাদের বাংলাদেশের প্রতি টান কমে গেছে।

তৃতীয় প্রজন্মের লোকজন যখন ওখানে লেখাপড়া করছে তখন তারা চিন্তা করা শুরু করল কিভাবে ওখানে স্থায়ী হওয়া যায়। সে চেষ্টা তারা করছে। তৃতীয় প্রজন্মের লোকজনের সঙ্গে বাংলাদেশের আত্মীয়-স্বজনের কিন্তু যোগাযোগটা কম। বর্তমানে চতুর্থ প্রজন্ম ওখানে বসবাস করছে। তারা কিন্তু বাংলাদেশের কথা চিন্তাই করে না। তারা বাংলার ‘ব’-ও জানে না, ইংরেজিতে কথা বলে।

আমরা যেটা অভিজ্ঞতা, আমি দেখেছি ইংল্যান্ড থেকে এখন মাস ৬ মাসে কিছু টাকা পাঠানো হয় (যিনি ফার্স্ট জেনারেশনে গিয়েছে তার আত্মীয়দের জন্য)। জাকাতের টাকা, ফেতরার টাকা, অথবা একটা বাড়ি করল নতুবা কারো বিয়েতে কিছু টাকা পাঠায়। আগের মত কিন্তু আয়ের অধিকাংশ টাকা এখন বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে না। ফলে আগের মত যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স কিন্তু আসবে না, বরং কমবে। এটাকে বন্ধ করার কোনো উপায় নাই।

আমি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া গিয়েছি, ওখানের অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষিত। ওখানে বিয়ে করার সুযোগ আছে, বাড়ি করারও সুযোগ রয়েছে। ফলে ওরা বাংলাদেশে টাকা না পাঠিয়ে ওখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করার চেষ্টা করছে। ফলে অস্ট্রেলিয়া থেকে টাকা আসার সম্ভাবনাও কম, আমেরিকাতেও একই অবস্থা।

এজন্য রেমিট্যান্স আদায়ে আমাদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে। ওখানে যে শ্রমিকরা যায়, তারা ওই দেশে বাড়ি করার কথা চিন্তা করে না এবং সুযোগও নাই। যতটুকু আয় করে ততটুকুই সে বাংলাদেশে পাঠাতে পারছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিন্তু টাকা আসার সম্ভাবনা বাড়ছে। যত আমরা দক্ষ শ্রমিক পাঠাবো ততই রেমিট্যান্স বেশি আসবে। এছাড়াও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে মালেয়শিয়া ও সিঙ্গাপুরে। এসব জায়গায় আমাদের শাখা বাড়াতে হবে। এছাড়া আফ্রিকা থেকেও আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। যদিও ওখানেও বাড়ি করার সুযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি রেমিট্যান্স প্রবাহে সামান্য স্থবিরতা আসার কারণ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নতুন নতুন আইনকানুন। শ্রমিকদের এত আইনকানুন পরিপালনের সুযোগ নেই। ফলে টাকা হুন্ডি হচ্ছে।

রেমিট্যান্স সংগ্রহে ইসলামী ব্যাংক কেন শীর্ষে, সরকারি ব্যাংকগুলো কেন ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারছে না?

ইসলামী ব্যাংকের অনেকগুলো এজেন্ট আছে সৌদি আরবে। কিন্তু আমাদের ব্যাংকগুলো তেমন শাখা নেই। তার মানে কিন্তু এই নয়, আমাদের শাখা ওখানে বাড়ালে দেশে রেমিট্যান্স আসা বাড়বে। বরং আগে যে রেমিট্যান্স আসতো তাই আসবে। কিন্তু উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাবে। কারণ, ইসলামী ব্যাংক মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রত্যেকটি শ্রমিকের সঙ্গে তাদের সখ্যতা গড়ে তুলেছে; যার ফলে এখন আমরা নতুন করে ওই অঞ্চলে ব্যবসা সম্প্রসারণ করলেও তেমন লাভ হবে না।

চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে রূপালী ব্যাংকের শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ৮ দশমিক ৭০ টাকা। কিন্তু বিগত ৫ বছর যাবত প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় ছিল। হঠাৎ করে ব্যাংকটির লোকসান হওয়ার কারণ কি?

আমি রূপালী ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর, আমাদের সঠিক অবস্থানটা চিহ্নিত করতে বলেছি। কারণ সঠিক কর্ম-পরিকল্পনা ও তার প্রয়োগ করতে হলে অবশ্যই আগে নিজের অবস্থানটা ঠিকভাবে জেনে নেওয়া উচিত। কেননা কোন ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছি সেটা নির্ধারণ করতে না পারলে আমাদের সফলতা অর্জনে অনেক বাঁধা আসতে পারে। আগে মেয়াদোত্তীর্ণ ও খেলাপি ঋণ সঠিকভাবে নিরূপণ না করে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আবার যে স্থানগুলোতে আমাদের প্রভিশনিং করার কথা ছিল তা যথাযথভাবে করা হয়নি। ফলে ব্যাংকের বাস্তবিক অর্থে মুনাফা দেখানো হলেও অবস্থা ছিল নড়বড়ে।

তিনি বলেন, মোটকথা যে লোনগুলো ক্লাসিফাইড করার কথা ছিল সেগুলো ক্লাসিফাইড করা হয়নি। সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছি প্রভিশনিং ও ক্লাসিফাইড লোন বের না করার কারণে। আমরা ২০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছি। এ ধরনের মিথ্যা মুনাফা করে ৯০ কোটি টাকা সরকারকে ট্যাক্স প্রদান করেছি। অর্থাৎ প্রফিট করলাম মিথ্যা কিন্তু জেনুইন ট্যাক্স দিলাম সরকারকে। এতে ব্যাংকের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এদিকে অটোমেশনের ফলে এবার ক্লাসিফাইড লোন না দেখিয়ে মুনাফা দেখানো কিংবা প্রভিশনিং না করে মুনাফা দেখানোর কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে সেপ্টেম্বরে অর্থাৎ তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকের সঠিক অবস্থা উন্মোচিত হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে আরো কিছু তথ্য বের হতে পারে।

অতীতে আমরা যে লাভ করেছি, যে ভাবেই তা হোক না কেন। এখন আমরা আমাদের সঠিক অবস্থানে তুলে এনেছি। ফলে, মুনাফা ও শেয়ার প্রতি আয়ে নেগেটিভ প্রভাব পড়েছে। তবে আমার বিশ্বাস আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক আবারো মুনাফায় ফিরবে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় নামে বেনামে কৃষি ঋণ তুলে, ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে? এ অনিয়ম রোধে কি ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন?

আপনি ঠিকই বলেছেন, গত ৫ বছর আগে এমন হত। বেনামে ঋণ গ্রহণ করে কেউ কৃষকের নামে অর্থ উত্তোলন করলেও ওই ঋণের অর্থ কৃষক পায়নি। কিন্তু এখন আর এ সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার যে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে, তা যে কতটুকু ইতিবাচক তা এখন আমরা ব্যাংকাররা প্রত্যেকে উপলদ্ধি করতে পারছি। এই অ্যাকাউন্ট হওয়ায় এখন আর আগের মতো কৃষি ঋণের অর্থ নগদ প্রদান করা হয় না। বরং ওই কৃষকের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। ফলে, আগে কৃষক ঋণ পেলেও দুই তিন হাত ঘুরে কৃষকের হাতে পৌঁছাত। ফলে ফড়িয়ারা এখান থেকে ফায়দা লুটত। কৃষক তার ঋণের অর্থ যথাযথভাবে পেত না। এখন কিন্তু এটার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ৫ বছর আগে আমাদের সিস্টেমের কারণে যেসকল দুর্নীতিগুলো হত এখন কিন্তু তা হচ্ছে না। কারণ সিস্টেম আগের তুলনায় অনেক ডিজিটালাইজেড হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে রূপালী ব্যাংকে কর্মচারী ইউনিয়ন (সিবিএ) নেতাদের ব্যাপক প্রভাব, তারা নাকি অফিসও করে না?

দেখুন, আমি এখানে এসেছি মাত্র দুই মাস। এখনও তাদের এমন কোনো কার্যক্রম আমার চোখে পড়েনি। তবে তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। আমি মনে করি, ম্যানেজম্যান্ট যদি তাদের মোটিভেট (অনুপ্রেরণা) করে তবে তারা আরো বেশি কাজ করবে। কারণ, তারা তো ব্যাংকের একটা অংশ।

আগামীকাল বুধবার থাকবে রূপালি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিউর রহমান প্রধানের সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব।

সূত্র : পরিবর্তন ডট কম।

Recent Posts

Leave a Comment