শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য

 In খোলা কলাম
গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্যের বিষয়ে আমি অনেকবার লিখেছি। এখন এই নৈরাজ্য সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও এ নিয়ে নানা রকম তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী সব সময়েই শিক্ষা ক্ষেত্রে তার কৃতিত্ব বিষয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে চললেও তার আমলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে ধরনের নৈরাজ্য দেখা গেছে এবং দেখা যাচ্ছে তার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই।

পাঠ্যপুস্তকে ছাপার ভুল তো এখন সামান্য ব্যাপার। ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের লেখার শব্দ পরিবর্তন থেকে নিয়ে অনেক রকম হস্তক্ষেপ যেভাবে করা হচ্ছে সেটা অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। কিন্তু সরকার যেভাবে তাদের শিক্ষামন্ত্রীর মাধ্যমে শিক্ষাকে ‘সৃজনশীল’ করার চেষ্টায় নিযুক্ত আছে তাতে এ নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কুসুমকুমারী দাশের কবিতা বিকৃত করা নিয়ে যা বলা হয়েছে তা হাস্যকরও বটে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এর ফলে কবিতার ‘মূল ভাবার্থ’ পরিবর্তন হয়নি! (যুগান্তর, ১৫.০১.২০১৭)। এর থেকে দায়িত্বহীন ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য আর কী হতে পারে? কিন্তু সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেভাবে শিক্ষাসংক্রান্ত তাদের ‘সৃজনশীল’ নীতি কার্যকর করছে তাতে এটা এখন পরিণত হয়েছে একটা স্বাভাবিক ও নিয়মিত ব্যাপারে।

লেখকদের লেখার শব্দ পরিবর্তন শুধু কুসুমকুমারী দাশের কবিতাতেই করা হয়নি। প্রথম শ্রেণীর বাংলা বইয়ের ‘ও’তে ‘ওড়না’ লেখা হয়েছে। ‘অ’তে অজগরের পরিবর্তে অজ (ছাগল) লেখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ছাগল বোঝাতে এবং শিক্ষার্থীদের ‘আনন্দ’ দিতে আম খাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়েছে (যুগান্তর, ১৫.০১.২০১৭)। তৃতীয় শ্রেণীর ‘হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ বইয়ের পেছনে লেখা হয়েছে, ‘Do not heart anybody’! (যুগান্তর, ১৫.০১.২০১৭)। এ ছাড়া অন্যসব ভুলেও পাঠ্যপুস্তক ভর্তি। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েকজনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কী এসে যায়? এর ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল আর হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ এ ক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রী নিজেও বেপরোয়া। এটা স্বাভাবিক। কারণ যেসব ভুলত্রুটিতে এখন পাঠ্যপুস্তকগুলো ভর্তি হয়ে আছে তার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে কেউ দায়ী করছে না। শিক্ষামন্ত্রীও নিজের দায় স্বীকার না করে অন্যদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। অথচ এ ক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীরই প্রথমে দায়িত্ব স্বীকার করার কথা। সততা থাকলে এর জন্য তার পদত্যাগও করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের চিন্তাভাবনা ও আচরণ তো অপরিচিত।

এখানেই শেষ নয়। প্রথম শ্রেণীর বইয়ের শেষ কভার পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘শিক্ষা দিয়ে গড়বো দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’! এটা কি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আমলে ছাড়া অন্য কোনো অবস্থায় বা অন্য কোনো দেশে সম্ভব? এভাবে একেবারে নিুস্তরের পাঠ্যপুস্তকে যে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে তার ফলে শিশুদের চিত্তের বিকাশ কি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না? এটাই কি শিক্ষা ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার উদাহরণ? আসলে ‘সৃজনশীল শিক্ষা’ বলে যে কথা এখন সরকারিভাবে প্রচলিত হয়েছে এর অর্থ বোঝা মুশকিল। এ ধরনের কথা দুনিয়ার অন্য কোনো দেশে শোনা যায় না। বাংলাদেশেও আগে কোনোদিন শোনা যায়নি। এটা বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীরই আবিষ্কার! নিজেদের শত দোষত্রুটি, শিক্ষা ক্ষেত্রের রাজনীতিকরণ এবং তার ফলে সৃষ্ট নৈরাজ্য ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যেই এভাবে ‘সৃজনশীল শিক্ষা’, ‘সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি’ ইত্যাদির কথা এখন বলা হচ্ছে। কিন্তু ‘সৃজনশীলতা’র নামে এভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা কীর্তি করে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা এখন ধ্বংসের মুখোমুখি। বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে একজন ছাত্র খুব ভালো ফল করে ‘কৃতিত্বের’ সঙ্গে পরীক্ষায় পাস করলেও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের যোগ্যতা সে অর্জন করছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন আগে এক ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া হাজার হাজার ছাত্রের মধ্যে মাত্র চার-পাঁচজন পাস করার ঘটনার মধ্যেই এর অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়।

এখানে এ প্রসঙ্গে এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমানে যে নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা দেখা যাচ্ছে, ভাঙনের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। সারা দেশে সামাজিক সম্পর্ক, প্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা, রাজনীতি ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্যিক অবস্থা এখন বিরাজ করছে তার থেকে শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট ও নৈরাজ্য দেখা যাচ্ছে তাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

১৫.০১.২০১৭

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Recent Posts

Leave a Comment