ট্রাম্পের একদেশ অভিলাষ

 In খোলা কলাম

নেভে গরডন
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন বিরোধের দুই দেশভিত্তিক সমাধানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আর জোর দেবে না। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের কূটনীতি তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করা হল। হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি দুই দেশ এবং এক দেশভিত্তিক সমাধানের পথ খুঁজছি’; ‘আমি ওটাই পছন্দ করি যেটা উভয় পক্ষ চায়। আমি অনেক খুশি হবো ওই সূত্র নিয়ে যেটা ইসরাইল-ফিলিস্তিন উভয়ে গ্রহণ করে। তবে যে কোনো একটা নিয়েও আমি এগিয়ে যেতে পারি।’
যদিও ট্রাম্পের ঘোষণায় ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি সায়েব ইরেকাত ক্ষুব্ধ হয়েছেন, জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি তৎক্ষণাৎ প্রেসিডেন্টের বিবৃতির বিপরীতে জোর দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন অবশ্যই দুই দেশভিত্তিক সমাধান প্রস্তাব সমর্থন করে আসছে এবং ট্রাম্পের ঘোষণাকে প্রকৃতপক্ষে ইতিবাচক একটি অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
যদিও ট্রাম্প ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকারকে সমর্থন করছেন বলে মনে হয় না, তবে দুই দেশ সমাধান ফর্মুলা পরিত্যাগ (যা ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলন, অসলো, ক্যাম্প ডেভিড, টাবা এবং আরও অনেক চুক্তি ও আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে) যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি একটি বিতর্ক নিয়ে আসতে পারে।
ইসরাইল বর্তমানে জর্ডান ভ্যালি থেকে ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী জায়গা নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে একটি দেশই বিদ্যমান। যা হোক দুই দেশ নীতির ওপর ভর করে অতীতের আলোচনাগুলো ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে ইসরাইলি দখলদারিত্ব বজায় রাখার সুযোগ তেল আবিবকে দিয়েছে। সেখানে বর্তমানে ৬ লাখের বেশি ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারী বসবাস করছে। দুই দেশ নীতি একটি অলিক কল্পনার বেশি কিছু নয়, যা ব্যবহার করে ইসরাইল একদিকে দখলদারিত্ব রক্ষা করছে, অন্যদিকে কলোনি স্থাপন প্রকল্প শক্তিশালী করছে। বলা যায়, দুই দেশ নীতি আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
দুই দেশভিত্তিক সমাধানের নমুনাটি পরিবর্তনের মাধ্যমে আলোচনার মানদণ্ডও পরিবর্তিত হবে। যদি দুই দেশ কাঠামোর মাধ্যমে তর্কের মূল পয়েন্টগুলো- ১৯৬৭ সালের সীমানা থেকে ইসরাইলের দখলদারিত্ব সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, জেরুজালেমের মর্যাদা ও একে খণ্ডিতকরণ এবং সব ফিলিস্তিনি নাগরিকের ফিরে আসার অধিকার- স্বীকার করে নেয়া হয় তাহলে একদেশ কাঠামো নিয়ে আগে বা পরে আলোচনার ক্রমিক বিষয়বস্তু হবে জাতিবিদ্বেষ থেকে গণতন্ত্রায়নে পদার্পণের ওপর জোর দেয়া।
ইসরাইল যেসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানে বর্তমানে দুটি আইনি পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি করা হচ্ছে ইসরাইলি ইহুদি ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য, অন্যটি অধিকৃত ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের জন্য। এমন একটা পরিস্থিতি যে কোনো যৌক্তিক সংজ্ঞাতেই জাতিবিদ্বেষ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিপরীতে, কেবল একদেশ কাঠামো গ্রহণ করা হলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্ন সামনে আসবে এবং কীভাবে ইসরাইলি ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির শাসনের একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা যায়, ক্ষমতা ভাগের উদার গণতান্ত্রিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্তভাবে সে আলোচনার সূত্রপাত হবে।
ইহুদি ইসরাইলিদের বাইরে অনেক ফিলিস্তিনি এরই মধ্যে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, যদিও বর্তমানে তারা ইসরাইলি দখলদারিত্বের মধ্যে রয়েছেন, দেশটির অবৈধ বসতিস্থাপনের বিরোধিতাকারীদের অবস্থান অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও দুই দেশভিত্তিক সমাধানের দিকে তাদের চালিত করবে। নেতানিয়াহু যখন বর্তমান সন্ধিক্ষণ থেকে হাজার মাইল দূরে, তখন ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে বসবাসকারী ১ কোটি ৩০ লাখ ইহুদি ও ফিলিস্তিনির ভবিষ্যতের জন্য টেকসই একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সমর্থনের জন্য বিশ্বনেতাদের বাধ্য করতে আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান জাগরণের এটাই সঠিক সময়। ট্রাম্প নিজেই এ ধরনের একটি পদক্ষেপ নেবেন, এমন সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তা সত্ত্বেও তিনি এমন একটি সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছেন।
কাউন্টারপাঞ্চ ডটকম থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম
নেভে গরডন : লেভারহালম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর

Recent Posts

Leave a Comment