দীর্ঘশ্বাসের শব্দ : অমলিন গল্পগ্রন্থ

 In শিল্প-সাহিত্য

ইকবাল পারভেজ

মানুষ কবে, কখন, কোথায় গল্প বলা শুরু করেছিল, তা আমরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না, তবে বলতে পারি, মা তাঁর সন্তানকে গল্প শুনাতেন, ঘুম পাড়াতেন। গল্পে স্বপ্ন থাকতো, কখনো দৈত্য দানব, বর্গীদের ভয় থাকতো। শিশু ভয়ে, স্বপ্নে ঘুমিয়ে পড়তো। অশ্বথ গাছের নিচে কোন এক সাধু তার শিষ্যের সাথে গল্প করছেন। মহাকাল সৃষ্টির গল্প, স্রষ্টার গল্প, কীভাবে ধর্ম এলো, তার গল্প। কোন এক প্রেমিক প্রেমিকা গল্প করছে মোবাইলে। আগে লোকেরা আসর বসিয়ে গল্প শুনতো। কালে কালে গল্প বলার ধরণ পাল্টেছে, স্থান পাল্টেছে। মুখে মুখে ঘুরে ফেরা গল্পকথারা ছাপার অক্ষরে স্থান নিয়েছে কাগজ আবিষ্কারের পর হতে। আজ অবধি লেখা গল্প আমরা পাঠ করছি। তেমনি এক গল্প পাঠ নিয়ে গল্পের আসরে যোগ দিয়েছেন কাদের পলাশ। তাঁর গল্প গ্রন্থের নাম দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। বিশটি গল্প নিয়ে বইটি আমাদের কাছে এসেছে। এখন গল্পের দারুন সময় যাচ্ছে। এই সময়ে গল্প নিয়ে যোগ দিয়েছেন গল্পকার।

কাদের পলাশের গল্পে আছে বিভিন্নতা। আছে বৈচিত্র, রংয়ের ব্যবহার। আকাশের রং, মানুষের মনের রং, ক্ষণে ক্ষণে সেই রং বদল হয়। সেই বদল দেখা দেয় ব্যক্তিতে, পরিবারে, সমাজে।

থুথু একটি গল্পের নাম। এই গল্পের ‘কালো রঙের মানুষ নেপাল’। সমাজের বর্ণহীন লোক নেপাল একজন জেলে। তাঁর গায়ে দিনে দিনে কালো রঙ চড়ে, রোদের কালো, আলকাতরার কালো, নদীর কালো জলের কালো, সংসারের কালো। মাথার উপর যে দো-চালা ঘর, সে মাছ বেঁচা টাকার লাভ নয়। এন.জি.ওর দেওয়া খড়গ। সপ্তাহান্তে কিস্তির টাকার কালো ছায়া। নেপালের জীবনে ছায়া দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হয়। ফি-বছর একটি করে সন্তান বাড়ে। জেলে পল্লীতে আদম বাড়ে। খবর আসে নেপালের ঘরে এ বছর পোলা হইছে। নেপাল দেঁৗড়ে ঘরে যায়। ছেলের মুখ দর্শনে থুথু ছিটায়। তাঁর সমৃদ্ধির সোপান হবে এই ছেলে, তাঁর জীবনের কালো ছায়া বিদূরিত করে দিবে। মানুষের নজর থেকে, ভূত প্রেতের নজর লাগা থেকে বেঁচে থাকার জন্য নেপাল ছেলের গায়ে থুথু মারে। আমরা জানিনা এই থুথু ছেলেটিকে রক্ষা করবে কী-না। নাকি নেপালের জীবনে কালো বাড়িয়ে তুলবে।

‘ভালো নেই অছিম’ গল্পের নাম। ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত খেঁটে খেঁটে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক অছিম উদ্দিন সফল একজন মানুষ। বি.এ পাস বড়ো ছেলে দোকানদার, অ্যাডভোকেট ছোট ছেলে বউ বাচ্চাসহ শহরে থাকে।

অছিম উদ্দিন ভাবে, কী লাভ সন্তানে। কেউ কাছে নাই। স্ত্রী অসুস্থ। অথচ কতো পরিবর্তন, আগে এ-বাড়ি ও বাড়ি যেতে নৌকা বা বাঁশের সাঁকো ছিলো। কুপির তেল ছিলো না। আজ গ্রামে সব পাঁকা সড়ক। কোথায় গেল নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। জীবন কতো পাল্টে গেছে। এতো শক্ত বন্ধনীর জীবন পেয়েও ‘ভালো নেই অছিম’। আমরা অছিম উদ্দিনের কষ্ট বুঝি, অভাব বুঝি। সমৃদ্ধিরও একটি অভাব বা অপূর্ণতা দেখি। আমাদের জীবন যেন সেই অপূর্ণতায় ভরে আছে।

‘ঘটক’ আমাদের জীবন ঘটিয়ে দিবেন, আমরা এপাশ ওপাশ ছটফটানির রাত কাটাই। ভোর হয়। ঘটক ঘরে প্রবেশ করে। বর খুঁজে দিবে। যথার্থ বর এনে দেবে। পাঁচশো টাকা ফিস লাগে। বারবার ফিস লাগে অতিথি খাওয়াতে হয় প্রতি মাসে, প্রতি সপ্তাহে। এভাবে বছরের পর বছর। মনিকা আর কনিকারা মাস্টার্স পাস করে বসে আছে। ঘটকের খবরের অপেক্ষায়। বড়ো মেয়েটির একবার বিয়ে হয়েছিল। এখন আবার দু’বোনই বিয়ের অপেক্ষায়। একদিন বড়ো মেয়ে বিয়ের প্রয়োজন থেকে নিজকে নিয়ে পালিয়ে যায়। আমরা তাঁকে আর খুঁজে পাই না। তাঁর জন্য আমরা বর খুঁজে খুঁজে অস্থির।

কাদের পলাশ মানব জীবনের এমন সব গল্প আমাদের শুনিয়েছেন। যা আমাদেরকে মানবতার অতলে নিয়ে যায়। তাঁর গল্পগ্রন্থের অন্যান্য গল্পগুলিও আমাদেরকে নীরব পাঠক বানিয়ে দেয়। তাঁর গল্প বলার ঢঙ সাদামাটা স্বাভাবিক। সরল বর্ণনায় গল্প এগুতে থাকে, আমরাও এগুতে থাকি।

কাদের পলাশের প্রথম গল্প গ্রন্থ এটি। এটি পাঠে পাঠক দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ পাঠের অপেক্ষায় থাকবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।

Recent Posts

Leave a Comment