‘আজও কত প্রাসঙ্গিকে’ অপ্রাসঙ্গিক কথা!

 In খোলা কলাম

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ |

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ২৩ মার্চ যুগান্তরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে আলোচনা করেছেন, লেখাটির শিরোনাম ‘আজও কত প্রাসঙ্গিক!’। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের ইতিহাসে এ যাবৎ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর অন্যতম। সাংবাদিক হিসেবে মাহফুজ উল্লাহর সামগ্রিক নির্মোহ বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ কথা ঠিক, বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়নি। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়।’ মুক্তি বলতে শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিও বোঝায়। বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে বলেছিলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের কেউ যদি ন্যায্য কথা বলেন, এবং তিনি যদি একজন হোন, তবুও আমরা তার কথা মেনে নেব।’ গণতন্ত্রের অন্যতম আদর্শ পরমতসহিষ্ণুতা এবং তার প্রতি যথাযথ মর্যাদাদান। তাই বঙ্গবন্ধুর সেদিনের কথা আজও একই রকম মূল্য বহন করে।
গণতন্ত্রের চর্চা কতটা সঠিকভাবে হচ্ছে, বর্তমান বাংলদেশে তা নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে, লেখকের এ বক্তব্য নিয়েও দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। কিন্তু হোঁচট খেতে হল যখন মাহফুজ উল্লাহ বলছেন, ৭ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিব কোথাও পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন-বঞ্চনার কথা একবারও বলেননি। তিনি যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন-বঞ্চনায় কথা বলতেন তাহলে পাকিস্তানিরা খুশি হতেন। সেদিনের পরিবেশ-পটভূমি ইত্যাদি যে লেখক জানতেন না তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। তবুও তিনি কেন এসব উপেক্ষা করতে চাইলেন? ’৭১-এর ১ মার্চ দুপুরে যখন রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধের আদেশ জানানো হল, তৎক্ষণাৎ বাঙালিরা রাস্তায় নেমে পড়লেন। এজন্য পিকেটিংয়ের প্রয়োজন হয়নি। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, অফিস, আদালত, কারখানা সব জায়গা থেকে একটি ঘটনা। সেদিন বাংলার মানুষ স্লোগান দিল, সব কথার শেষ কথা, বাংলার স্বাধীনতা। বস্তুত সেদিন বাংলার মানুষ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের অসামান্য সাফল্য তো জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের জন্য, এর জন্য তার দলকে তেমন পিকেটিংও করতে হয়নি। জনগণ শুধু জানতে চেয়েছে শেখ মুজিব কী বলেন।
এরকম পরিস্থিতি বিরাজমান থাকায় যখন ৭ মার্চের জনসভার ঘোষণা এল, তখন সবার প্রত্যাশা সেদিনই স্বাধীনতার ঘোষণা আসবে। পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা এরকম আশংকায় ছিল। সে সময় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। তিনি তার বইতে লিখেছেন, তিনি এরকম সশস্ত্র প্রস্তুতি নিয়েছিলেন- যদি একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়, তাহলে ঢাকা শহরকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হবে। জেনারেল খাদিম রাজা অবশ্য এ কথাও লিখেছেন, মুজিব তা তো করেননি, বরং আলোচনার একটা জানালা খুলে রেখেছেন। জেনারেল রাজা ইয়াহিয়ার ৬ মার্চের বক্তৃতার সমালোচনা করেছেন, যেখানে উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য সব দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর ওপর এবং ভুট্টো সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। উল্লেখ্য, ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় তাণ্ডবের জন্য যে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করা হয়েছিল, তার দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল খাদিম রাজা। এই যখন পরিস্থিতি, তখন ৭ মার্চ আলাপ করায় সুযোগ ছিল কি? উন্নয়ন-বঞ্চনার কথা তো পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই বলা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পাঁচটি দফার উল্লেখ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ইশতেহারে ২১ দফার ভেতরেই ছিল। ১৯৬০ কিংবা ’৬১ সালে লাহোরের পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ অর্থনীতিবিদ ড. নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড. আনিসুর রহমান, ড. আখলাকুর রহমানরা এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসলেন। তারা প্রস্তাব করলেন, ভৌগোলিক কারণে পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের জন্য পৃথক অর্থনীতি চালু করতে হবে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ছয় দফায় এর একটি সংযোজিত হয়।
সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ নিজেই স্বীকার করেছেন, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বক্তব্যের চিত্র তুলে ধরে আওয়ামী লীগ ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শিরোনামে একটি পোস্টার বের করেছিল। ’৭০-এর নির্বাচনী প্রচারের সময় বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, ছয় দফা হল বাঙালির মুক্তি সনদ। তিনি ছয় দফার ওপর জনগণের ম্যান্ডেট চান। জনগণ তা দিয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা তা মানতে রাজি নন। তাই শুরু হল নানা টালবাহানা। শুধু সামরিক শাসকরা নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল পিপিপির নেতা ভুট্টো সাহেব এ নির্বাচনের রায় মানতে রাজি নন, কেন তা একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ভুট্টোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন ব্যারিস্টার রফি রাজা। তিনি ভুট্টোর সঙ্গে ’৭২-এ ভারতের সিমলায় গিয়েছিলেন ভুট্টো-ইন্দিরা সম্মেলনে যোগ দিতে। তিনি তার বইতে লিখেছেন- Six points meant an over right transformation from a quasi unitary system to an extremely loose federation or in reality a confederal arrangement. It was the PPP’s understanding that the west wing would have to bear the financial burden of Rs. 38000 million out of the existing Rs 40000 external debt and the entire internal debt of Rs. 31000 million. The contribution of East Pakistan towards the cost of the central government would be only 24%, though their population was 56 pc of the total and moreover this could be set off the next fwe years over against reparations due from the west wing for past exploitation. As the representative of the west wing Zulfikar Ali Bhutto could not accept this position.
৭ মার্চ ’৭১-এর বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় যখন প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্ব এবং সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা, তখন ইনিয়ে বিনিয়ে উন্নয়ন বক্তৃতার সুযোগ নেই। রেসকোর্স ময়দানে জনতার যে প্রত্যাশা ছিল, বঙ্গবন্ধু সেটাই করেছেন।
মাহফুজ সাহেব আরও লিখেছেন, ‘রেসকোর্স ময়দানের পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনগুলো দাঁড়িয়ে ছিল; কিন্তু রাজনৈতিক বঞ্চনায় মুখে এ উন্নয়নকে পরিহাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবনের সিংহভাগ দেয়া হয়েছিল মেডিকেল কলেজকে সেই চল্লিশের দশকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, বাণিজ্য ও আইন অনুষদের বিভাগসমূহ খুবই স্বল্প পরিসরে কাজ করছিল। এরপর ’৬০-এর দশকে বর্তমান কলা ভবন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র এবং কয়েকটি হল অর্থাৎ ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয় যা একটি স্বাভাবিক উন্নয়ন কার্যক্রম। ’৫০-এর দশকে কোরিয়ার যুদ্ধের সময় পাটের আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য অত্যন্ত চড়া ছিল, যার ফলে পাকিস্তান পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছিল। বলা বাহুল্য, এ সবটুকুই পূর্ব পাকিস্তানের অর্জন। অথচ পূর্ব পাকিস্তানে আমদানির জন্য ব্যয় হয়েছিল সামান্য। বাকি সব নেয়া হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। পরিষ্কার হিসাব দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, ’৭০ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান যত উপার্জন করেছে, তার তুলনায় ব্যয় কম। অতএব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে উন্নয়ন, তা আমাদের ন্যায্য পাওনা, কোনো করুণা বা দয়া নয়।
’৬০-এর দশকে ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। ঢাকা হল (বর্তমান ড. শহীদুল্লাহ হল) এবং এফএইচ হলের মাঝের পুকুরে আমাদের বিনোদনের জন্য কর্তৃপক্ষ একটি নৌকা দিয়েছিল। সেটি উল্টাতো তবে ডুবতো না, আর পুকুরে তেলাপিয়া মাছ ছাড়া হয়েছিল, দু-একটা করে ভাজি খাওয়া হতো। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর টেলিভিশনের উদ্বোধন করেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রাবাসে একটি টেলিভিশন সেট কর্তৃপক্ষ বিনামূল্য দিয়ে গিয়েছিল। অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উন্নয়ন এবং ছাত্রদের চিত্ত-বিনোদনের এসব উদ্যোগের কথা বিবেচনা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কোনো আন্দোলনে শরিক হওয়া ঠিক হয়নি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সেই মহাসমাবেশ যোগ দিয়ে কি এহেন দুর্লভ উন্নয়নকে উপহাস করা হয়েছিল? আচ্ছা, ইংরেজরা এ দেশে উপনিবেশ শক্তি হিসেবে শুধু শাসনই করেনি, অনেক উন্নয়নও করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে রেললাইন স্থাপন করেছে। দিল্লি, কলকাতা, বোম্বাই- এসব শহরের কত উন্নয়ন ঘটেছে। হাইকোর্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ- এসব স্থাপন করেছে, এই উন্নয়ন যজ্ঞকে উপহাস করে ইংরেজকে তাড়ানো কি ঠিক হয়েছে? বুঝতে পারছি না কী উত্তর হবে?
লেখার শেষপ্রান্তে এসে মাহফুজ সাহেব একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, ’৭১-এর ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ গণপরিষদ যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা ও অনুমোদন করছে, সেটির পুনঃপাঠ প্রয়োজন। ঘোষণাপত্রটি একটি অনন্য সাধারণ দলিল। এখানে উল্লেখ রয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা। এ প্রশ্ন আবশ্যই করার অবকাশ রয়েছে যে, তিনটি বিষয় কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা নিশ্চিত করা হয়েছে। মাহফুজ উল্লাহ সাহেবের মতো সিভিল সোসাইটির বরেণ্য সদস্য এ নিয়ে কথা বলবেন এবং আমাদের কী করণীয় তার দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু এই নিবন্ধে তার যে বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করা হল, আবারও বিনয়ের সঙ্গে বলব, এ বক্তব্যগুলো অপ্রাসঙ্গিক ও অ্যান্টিক্লাইমেক্স।
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ : মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব

Recent Posts

Leave a Comment