আলো কিত মানুষ সাতকানিয়ার কাঞ্চনায় বুদ্ধিজীবী কামিনী কুমার ঘোষ। সাধারণ মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াতে নিবেদিত ছিলেন তিনি।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হবার পরও তার স্মৃতিচিহ্নটুকু ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ধরে রাখার উদ্যোগ কেউ কখনও নেয়নি। বরং বুদ্ধিজীবী কামিনী রায়কে হত্যা করার সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে যারা সহযোগিতা করেছিল তারা বর্তমান কামিনী রায়দের রক্তে রঞ্জিত এদেশে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
কামিনী রায় জীবদ্দশায় তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান কাঞ্চনা এস বি ঘোষ ইনস্টিটিউট নামক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুল সংলগ্ন একটি কলেজ এবং হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করার পর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত হন। এলাকার মানুষের জন্য সার্বক্ষণিক চিন্তায় মগ্ন থাকা এ মানুষটি মারা যাবার পর তার কর্মকা-ের কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী কেউ সংরক্ষণ করেনি।
জানা যায়, ১৮৮৮ সালের ১ জানুয়ারি সাতকানিয়ার কাঞ্চনা গ্রামে কামিনী কুমার ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বালক কামিনী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন।
কামিনীর কাকা বঙ্গচন্দ্র ঘোষ চট্টগ্রাম আদালতে ১৯০১ সালে মোক্তার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন ভাইপো মেধাবী কামিনীকে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন।
কলেজিয়েট স্কুলে সুনামের সাথে লেখাপড়া শেষ করে ১৯০৬ সালে এন্ট্রান্স বা প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে সরকারি বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন কামিনী। ১৯০৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯১০ সালে গণিতে অনার্সসহ প্রথম বিভাগে বিএ পাস করেন কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এমএস পাস করেন।
একই সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন শাস্ত্রের পরীক্ষায় বৃত্তিসহ ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। কলিকাতা থেকে ফিরে কিছুদিন কাকা বঙ্গচন্দ্র ঘোষের সাথে আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে ১৯১৩ সালে চট্টগ্রাম জজ কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন।
দীর্ঘ এক যুগেরও অধিক সময় চট্টগ্রাম জজ কোর্টে আইন ব্যবসা করাকালীন সময়ে বাঁশখালীর পাল গ্রামের চৌধুরী বাড়ির কন্যা শৈল বালার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কামিনী কুমার রায় ২৮ বছর চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য ও সাত বছর সহ-সভাপতি ছিলেন। এছাড়া ষোল হাজার চট্টগ্রাম জেলা স্কুল বোর্ডের সদস্য, কাঞ্চনার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, বেঞ্চ কোর্টের সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭০ সালের আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করলে চক্রান্তের শেষের দিকে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি নিধনে ঢাকা শহরে সামরিক আক্রমণ শুরু করে। ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল শনিবার বেলা ১২টায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি
দল তাদের দোহাজারি ক্যাম্প থেকে হঠাৎ কাঞ্চনা গ্রামে আক্রমণ চালায়।
সামরিক বাহিনী কামিনী রায়ের বাড়ি আক্রমণ করলে সামরিক বাহিনীর সাথে থাকা জনৈক রাজাকারের ইঙ্গিতে কামিনীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ-এ কামিনী রায়ের হত্যাকারী ঐ রাজাকারের পরিচয় উল্লেখিত আছে।
স্বাধীন এদেশে অদ্যাবধি হলো না ঐ রাজাকারের বিচার সত্যাসত্য অনুসন্ধান করে।