আমাদের ঢাকা নদী চলে বাঁকে বাঁকে

 In খোলা কলাম

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঁচিয়া থাকিলে নিশ্চয়ই লিখিতেন, ‘আমাদের ঢাকা নদী চলে বাঁকে, বাঁকে/ বৃষ্টি পড়িলে তাহার হাঁটু জল থাকে/ পার হয়ে যায় রিক্সা,পার হয় গাড়ি/ খানা খন্দ ভরা নদী/ ময়লা তায় ভারি।’

সত্যিই দেশের রাজধানী এবং বাণিজ্য নগরী দুটিই পানির নিচে তবু নাকি এখনও একে বন্যা বলা যায় না। ঢাকার জুরাইন, মান্ডাসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা পুরোটাই পানির নিচে। সেখানে একতলা পর্যন্ত পানি উঠে গেছে তবু নগর কর্তৃপক্ষের কোন হুঁশ নেই। আর চট্টগ্রাম শহরে তো রীতিমতো নৌকা চলছে। চট্টগ্রামবাসী ‘ওরে সাম্পানওয়ালা’ গানটি মর্মে মর্মে অনুভব করছেন।

‘এমন অরাজকতা কোন সভ্য দেশের রাজধানী ও প্রধান বাণিজ্য নগরীতে চলতে পারে একথা অবিশ্বাস্য।’

এমন অরাজকতা কোন সভ্য দেশের রাজধানী ও প্রধান বাণিজ্য নগরীতে চলতে পারে একথা অবিশ্বাস্য। এখন আবার বলা হচ্ছে নগরবাসী নিজেই নাকি এজন্য দায়ী। এক চিপসের প্যাকেটের কারণেই নাকি ঢাকায় জলাবদ্ধতা। এটা একটা কথা হলো? বিশ্বের সকল দেশের নাগরিকই চিপস খায়। কিন্তু তার প্যাকেটটি ফেলে ডাস্টবিনে। আমাদের নগরবাসীকে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে বাধ্য করার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনেরই। সিংগাপুরের মতো রাস্তায় ময়লা ফেললে যদি জরিমানা করা হয় এবং যদি রাস্তায় ঠিকঠাকমতো ডাস্টবিন থাকে তাহলে তো নগর নোংরা হয় না।

একসময় ধোলাই খাল ছিল শহরের বুকে রক্তবাহী শিরার মতো। ধোলাই খাল দিয়ে সকল জমা পানি বের হয়ে যেত। জলাবদ্ধতার কোন অবকাশ ছিল না। আমি নিজে শৈশবে ধোলাই খালের কিছু অংশ, লোহার পুল, সেগুনবাগিচায়, পরীবাগে সরু খাল ও নালা দেখেছি। পুরানা পল্টন ও নয়া পল্টনের মাঝামাঝি এলাকায় সরু একটি খাল এই সেদিন পর্যন্তও ছিল। এখন সেসবের চিহ্নও নেই। সব ভরাট করা হয়ে গেছে। নগরীর যাবতীয় খাল, বিল, পুকুর, নালা ভরাট করে সেখানে বাড়ি ঘর উঠেছে। লেক ভরাট করে বহুতল বাড়ি বানিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে লেক ভিউ। যদি সম্ভব হতো ভূমিদস্যুরা হয়তো বঙ্গোপসাগরে মাটি ফেলে সেটা ভরাট করে সেখানে হাউজিং করতো আর নাম দিতো ‘সাগর বিলাস। ’

ঢাকার আশেপাশের নদীগুলো ভরাটের তো রীতিমতো উৎসব চলছে। চট্টগ্রামেও একই অবস্থা। এসব অবৈধ স্থাপনা এবং ঘুষ দিয়ে বৈধ করা স্থাপনার কারণে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। কারণ বৃষ্টির পানি গড়িয়ে নেমে যাবার কোন জায়গা তো খোলা রাখা হয়নি। ঢাকার তিনদিকেই নদী। কিন্তু এসব নদী ড্রেজিংয়ের কোন উদ্যোগ নেই। উল্টো কিভাবে নদীর তীর দখল করে নদীর উপরে বাড়িঘর নির্মাণ করে নদীগুলোকে গলা টিপে মারা যায় তার মহড়া চলছে। নদী ড্রেজিংয়ের নাম দিয়ে চলছে লুটপাট। অথচ সেগুলো যথাযথভাবে ড্রেজিং করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গা নদীকে তো এমনিতে খুন করা হচ্ছে কেমিকেল আর নানা রকম বর্জ্য ফেলে। তার সাথে চলছে নদীর তীর দখল। রক্তবাহী শিরার মতো ধোলাই খালকে বন্ধ করে দেওয়ায় শহরের করোনারি থ্রম্বসিস হয়েছে। হৃদযন্ত্রণায় ছটফট করছে শহর। নগরবাসীর দুরবস্থা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে এক কোমর পানি পার হয়ে। কর্মজীবীরা কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের সময় অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সবচেয়ে সংকটে আছে রোগীরা। হাসপাতালে জরুরি রোগী নিয়ে যেতে হলে চরম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পরিবারের স্বজনদের। কারণ বাড়ি পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে না অনেক জায়গাতেই।

অবৈধ স্থাপনা, জলাশয় ভরাট এবং নদীগুলোর যথাযথ ড্রেজিং না করার কারণে আজ ঢাকায় একটু বৃষ্টি হলেই পুরো শহর পানির নিচে তলিয়ে যায়। রাস্তার পাশের ড্রেনগুলো ময়লা আবর্জনায় ভর্তি। সিটি কর্পোরেশন নগরবাসীকে দোষ দিচ্ছে। কিন্তু নগরবাসীকে সঠিক পথে চালনার দায়িত্ব কি সিটি কর্পোরেশনের নয়? দুই দুই জন নগরপিতা থাকতেও আজ নগরবাসী এতিমের মতো অসহায়। সিটি কর্পোরেশন নিজেই তো শহরের প্রধান প্রধান অনেক সড়কে ময়লার স্তূপ করে রেখেছে। বিশাল খোলা ময়লার ভাগার করে রেখেছে রাস্তার পাশে। বৃষ্টিতে সেসব ময়লা ছড়িয়ে পড়ছে পানির সঙ্গে। বন্ধ করে দিচ্ছে অবশিষ্ট ড্রেনগুলোকেও।

জলাবদ্ধতার জন্য পলিথিনের দায়ও অস্বীকার করা যায় না। পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ। কিন্তু পলিথিনের পোটলা তো হরহামেশাই চলছে। পাট বা কাগজের ব্যাগ দিয়ে পলিথিনকে রিপ্লেস করার কথা। কিন্তু সে কথা কেউ রাখছে না। পুরান ঢাকায় আরও একটা বিপদ আছে। সেখানে ঘরে ঘরে ছোট ছোট কারখানা। যেগুলোর বেশিরভাগই অবৈধ। এসব জায়গায় ইলেকট্রিক লাইনও খুব বিপদ জনকভাবে নেয়া হয়েছে। কারখানার সামনে জমে থাকা পানি যদি কোনভাবে ইলেট্রিক তারের সংস্পর্শে আসে তাহলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা রয়েছে।

জুতার কারখানার সলিউশনও পানিতে মিশে গেলে চরম দূষণের আশংকা আছে। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ একেবারেই নির্বিকার বলে মনে হচ্ছে। দায় একা সিটি কর্পোরেশনের নয় একথা ঠিক। সংশ্লিষ্ট সব মহলের একযোগে কাজ করতে হবে। নইলে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা যাবে না। দরকার সবগুলো খালকে পুনর্খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদী ও খাল দখলমুক্ত করা। কিন্তু দখল যারা করেছে তারা চিপসখাওয়া ছোট বাচ্চা নয়। তারা সব রাঘব বোয়াল। এদের ধরতে গেলে অনেক কিছুতেই টান পড়বে। তাই দোষ চাপানো হচ্ছে চিপসের উপর। হ্যাঁ, নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। চিপসের প্যাকেটসহ পলিথিন ব্যবহার বন্ধ হোক। কিংবা ফেলা হোক ঠিক জায়গায়।

নগরবাসীকে বাঁচানো নগরপিতাদেরই কর্তব্য। সরকার যে কোনভাবে হোক ঢাকা ও চট্টগ্রামকে বাঁচাক। দখলমুক্ত করুক সব নদী ও খাল, বিল,জলাশয়। প্রশ্ন হলো বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?

লেখক : কবি, সাংবাদিক।

সূত্র : জাগো নিউজ

Recent Posts

Leave a Comment