কচুয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার দাতব্য হাসপাতাল!
কুমিল্লার একটি হাসপাতালে হৃদরোগজনিত কারণে এক নারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নানা ষড়যন্ত্র চলছে কচুয়ার দাতব্য চিকিৎসালয় হাসিমপুর ফয়েজুন্নেছা হাসপাতালের বিরুদ্ধে। এ হাসপাতালটি এখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। গ্রামীণ এলাকার গরিব-অসহায় মানুষকে সেবাদানকারী এ দাতব্য হাসপাতালটি বন্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। সোমবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে পুলিশের উপস্থিতিতে হাসপাতালে থাকা রোগী ও স্টাফদের বের করে দিয়ে তা সীলগালা করা হয়। পরে ১৮ ঘণ্টা পর সেই তালা খুলে দেয়া হয়। গরিব-অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবা দানকারী একটি প্রতিষ্ঠান করে বন্ধ করে দেয়ার এ ধরনের ষড়যন্ত্র ও কা-ে বিস্মিত মানুষজন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাসপাতালে সেবা নিতে আসা মানুষজনও। যদিও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, তারা শুধুমাত্র ওই হাসপাতালে প্রসূতি ভর্তি কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করেছে। হাসপাতালের অন্যান্য কার্যক্রম চলতে কোনো বাধা নেই।
স্থানীয়রা জানান, হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমান এমপি ও তাঁর সমর্থকরা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পায়নি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান দাতব্য হাসপাতালও। এর আগেও চাঁদপুরে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে গোলাম হোসেনের নেতা-কর্মীরা স্বাগত জানাতে গেলে তাদের উপর হামলা করে ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপির সমর্থকরা।
জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার দেওকামা গ্রামের সিবি্বর মিয়ার স্ত্রী ৩ সন্তানের জননী হালিমা বেগমের প্রসব ব্যথা উঠার পর তাদের বাড়িতে স্থানীয় ধাত্রী দিয়ে প্রায় ৮ ঘন্টা বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা চালানো হয়। এতে করে হালিমা বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে তাকে কচুয়ার ফয়জুন্নেছা হাসপাতালে নিয়ে আসে স্বজনরা। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা তার অভিভাবকদের জানিয়ে দ্রুত অপারেশনের পরামর্শ দেন। তাদের সম্মতিতে রাত সাড়ে ১০টায় হালিমা বেগম সিজারের মাধ্যমে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের প্রায় আধাঘন্টা পর নবজাতকের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সযোগে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। আর মা হালিমা বেগম কচুয়ার হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে সেখান থেকে রিলিজ নেন। কিছুদিন পর এসে তিনি সেলাই কেটে যান। এরও কিছুদিন পর হালিমা বেগম কুমিল্লার একটি হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। হালিমা বেগমের ডেথ সার্টিফিকেটে বলা হয়েছে, তিনি হৃদরোগজনিত কারণে মারা গেছেন। জানা গেছে, ময়না তদন্ত অনুসারে রোগীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও এ ঘটনায় একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে গভীর রাতে সীলগালা করা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ জানতে চাইলেও সংশ্লিষ্টরা সদুত্তর দিতে পারেনি।
কচুয়ার হাশিমপুরের স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে বলেন, কুমিল্লার হাসপাতালে হালিমা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় আমাদের এলাকার দাতব্য হাসপাতালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র খুবই নিন্দনীয় ঘটনা। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আশাকরি ষড়যন্ত্রকারীরা গরিব-অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবার ভরসাস্থল এ হাসপাতালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেকে বিরত থাকবেন। রাজনীতি করতে হয়, অন্য ইস্যু নিয়ে করুন, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিয়ে নয়।
কচুয়া ফয়জুন্নেছা দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপক সুজন দাস জানান, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাই। পরদিন বিকেল ৫টায় বাচ্চাটির মৃত্যুর সংবাদ জানা যায়। আর বাচ্চাটির প্রসূতি মা হালিমা খাতুন গত ২৯ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে আমাদের হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক রিলিজ নিয়ে চলে যান। পরে গত ৫ আগস্ট হাসপাতালে এসে সিজারের সেলাই কেটে রিলিজ নেন। তারপর গত ১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার একটি বেসরকারি হাসপাতালে হালিমার মৃত্যুর সংবাদ পাই। তিনি বলেন, মৃত্যুর সংবাদ প্রাপ্তি পর্যন্ত ফয়জুন্নেছা হাসপাতাল তার স্বাস্থ্যগত উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে অবহিত নয়। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি- রোগীনি এ হাসপাতালে রুটিন প্যাসেন্ট ছিলেন না, তিনি আমাদের হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন নি। মৃতের সংশ্লিষ্ট অভিভাবক হাসপাতালকে দায়ও দিচ্ছেন না
তিনি অভিযোগ করে বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে হালিমা চান্দিনা থানাধীন হওয়া সত্বেও গত ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৯টায় নিহতের এক ভাইকে দিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কচুয়া থানায় হালিমার অকাল মৃত্যুর ব্যাপারে ফয়জুন্নেছা হাসপাতালকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করায়। অবস্থা যাই হোক ফয়জুন্নেছা হাসপাতাল গরিব মানুষদের দাতব্য প্রতিষ্ঠান। আমরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করছি এবং হালিমা খাতুনের বেদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করছি।
কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলিমা আফরোজ বলেন, সীলগালা সম্পর্কে আমরা কিছুই বলতে পারবো না। এটি হেল্থ বিভাগের বিষয়। তারা জানে।
কচুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ভিক্টিমের ভাই আবুল কালাম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এখনো আমরা হাতে পাইনি। হাসপাতাল সীলগালা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।
চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ সাইদুজ্জামান বলেন, অভিযোগের আলোকে আমরা ওই হাসপাতালের অন্তঃবিভাগ প্রসূতি সেবা তথা ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি। দাতব্য প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। যেহেতু অভিযোগ ছিল শুধুমাত্র প্রসূতি সম্পর্কিত, তাই আমরা শুধুমাত্র সে সম্পর্কেই প্রাথমিক ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা স্থায়ীভাবে কিছু করিনি। তদন্ত স্বাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।