বাস্তবতা পর্যালোচনায় বলা যায়, এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশন উভয়েই তাদের ইমেজ ফিরিয়ে আনতে মরিয়া। কিন্তু তাতে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের কী? আমরা সাধারণ দর্শক! মঞ্চে যখন যা মঞ্চস্থ হয়, আমরা তা চুপচাপ দেখে যাই। আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করি নিজেদেরকে আরও পাকাপোক্তভাবে খেলার পুতুল হিসেবে উপস্থাপন করতে। তাই বলছি, তারা থাকুক তাদের ইমেজ নিয়ে!
আমাদের প্রশ্ন হল, এমন পরিস্থিতিতে কে হতে যাচ্ছেন নাসিকের মেয়র? কারণ এ নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছি। কথা এখানেই শেষ নয়, এ নির্বাচনে ইমেজ রক্ষার্থে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে সহিংসতার প্রশ্নে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এটা যে তাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আরও বড় চ্যালেঞ্জটি ঝুলে আছে খোদ নির্বাচন কমিশনের সামনে।
সম্ভবত, এই নির্বাচনের পর আর কোনো নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকবে না বর্তমান কমিশনের। তাই অপবাদ ঘুচানোর তাদের এই শেষ সুযোগ। কারণ এই কমিশন এরই মধ্যে বেশ সমালোচনা ও নিন্দা কুড়িয়েছে। সামনে সুযোগ রয়েছে, সেই নিন্দা কাটিয়ে ওঠে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করার।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সম্ভবত এর প্রধান কারণ বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশ নেয়া। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বরাতে বলা যায়, সেখানে ভোটের আমেজও লক্ষ্যণীয়। কিন্তু ভাবতে হয় যখন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বক্তব্যে শুনি সব ক’টি কেন্দ্র ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। এ ঝুঁকির কারণ কী? ওসমান পরিবারের বাইরে বিদায়ী মেয়র আইভীর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভ? সময়ের ব্যবধানে অবশ্য এ সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। তাই এসব ভাবনা রেখে একটু অন্য বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি।
এবারের নাসিক নির্বাচন নানা কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার ধারণা। এমন ধারণার সমর্থনে বলতে হয়, নির্বাচন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তাহলে ফলাফলের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠবে দুই দলের জনপ্রিয়তার বর্তমান অবস্থা। এমনটি বললাম এ কারণে যে, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুই দলের জনপ্রিয়তার পারদ কতটা ওঠানামা করেছে তা নির্ভুলভাবে আমাদের জানার সুযোগ হয়নি। কারণ ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল একতরফাভাবে।
সরকার ইমেজ রক্ষার লক্ষ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে বাহবা নিতে চাইতে পারে। এই প্রত্যাশাটি পূরণ হলে সরকার কিছু হারাবে না, বরং অনেক কিছু অর্জন করবে। দেশে-বিদেশে জানাতে পারবে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ রাজনৈতিক; বাস্তবে তারা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ সৃষ্টি করে; কিন্তু বিরোধী দল ব্যর্থতা ঢাকতে সব ওলটপালট করে দেয়।
এছাড়াও আসন্ন নির্বাচনের বিশেষ তাৎপর্য আছে। আর তা হলো, এই নির্বাচনের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। শুধু কি তাই? এ নির্বাচনের ফলাফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশও অনেকটা নির্ধারিত হবে বলে মনে করি।
আমার ধারণা সত্য হতে পারে ধরে নিলে বলতে হয় শাসক দলের উচিত হবে নির্বাচনটিকে যাবতীয় অনিয়ম থেকে মুক্ত রাখা, যেন দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠান করা সম্ভব বলে প্রমাণ করা যায়। অবশ্য এক্ষেত্রে বিএনপির উচিত হবে সর্বাত্মক শৃংখলার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়া এবং ক্ষমতাসীন দল যেন সহিংসতার অভিযোগ যাতে তুলতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা।
বড় দুই দল নিয়ে তো কত কথাই হলো। এবার নির্বাচন কমিশন নিয়েও কিছু বলা প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। বলতে চাচ্ছি, বিগত সময়ে যা যাওয়ার তা তো হয়েছেই; কিন্তু শেষটা ভালো করে আগের খারাপগুলো ধামাচাপা দেয়ার সুযোগ আছে নির্বাচন কমিশনের। অবশ্য নির্বাচন কমিশন চাইলেই তা পারবে না। কারণ পুতুল যে নিজে নাচে না, কর্তার ইচ্ছেতে নাচে! তাই ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচকমণ্ডলীর উচিত হবে কমিশনকে তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের সুযোগ দিয়ে বিদায়কালে অন্তত নিজেদেরকে স্বচ্ছ হিসেবে জনতা সমীপে হাজির হওয়ার সুযোগ দেয়া।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ অবশ্য সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, কমিশনের মেয়াদে এটি শেষ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে নিয়ে কমিশন খুব সিরিয়াস। সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ভোট করতে আমরা বদ্ধ পরিকর। বর্তমান ইসির বিদায়ের আগে এ নির্বাচনকে নিয়ে কেউ যেনো প্রশ্ন না তুলতে পারে, বিতর্ক সৃষ্টি করতে না পারে সে বিষয়ে সজাগ রয়েছে ইসি। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর এসব ছেলে-ভুলানো কথায় আমি স্বস্তি পাই নি। বরং আগামী ২২ তারিখে তাঁর এসব বক্তব্যের সমর্থনে প্রমাণ চাইব। কারণ আমি মনে করি, বিগত সময়ের প্রতিটি নির্বাচনই তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। তাতে তাঁরা কতটা সফল হয়েছেন, তা জনগণ জানে।
রাজনৈতিক দল আর ইসি নিয়ে বললেই কি বলা শেষ? অবশ্যই না। স্থানীয় ভোটারদেরও দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে কিছু করণীয় আছে। আর তা হলো একটি সুস্থ নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কারণ উন্নত নির্বাচনী সাংস্কৃতিক চেতনাই পারে ভবিষ্যত নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে। নারায়ণগঞ্জবাসী কি তা করে দেখাতে পারবেন না? আপাতত পারবেন বলে মনে করছি।
নারায়ণগঞ্জের এ নির্বাচন নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহের আরও একটি কারণ আছে। কারণটি হলো, এখানকার আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুই মেরুতে বিভক্ত। যে বিভক্তির সূচনা হয় বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়। শহরের চাষাঢ়া বালুর মঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় মঞ্চে উঠা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান (আইভীর পিতা) মরহুম আলী আহম্মদ চুনকা ও সাবেক এমপি একেএম শামসুজজুহার (শামীম ওসমানের পিতা) মধ্যে তৈরি হওয়া বিবাদ পরবর্তীকালে মিটলেও ২০১১ সালের সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তা আবার ফিরে আসে শামীম ওসমান ও আইভীর মধ্যে। আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপের ফলে বিপরীত মেরুতে ঠাঁই নেয়া নেতাকর্মীরা পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করলেও তারা আইভীর বিজয়ে কতটা আন্তরিক হয়ে কাজ করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় আছি।
নির্বাচনে হার-জিতের বিষয়টি মুখ্য নয় বলেই মনে করি। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি, নির্বাচনে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত দৃশ্য-অদৃশ্য শক্তির প্রভাবমুক্ত শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রত্যেক ভোটার যাতে যে কোনো প্রকার চাপ ও ভয়ভীতিমুক্ত হয়ে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারেন, এর নিশ্চয়তা দিতে হবে ইসি এবং প্রশাসনকে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থী, পক্ষ ও দলের প্রতি আহ্বান থাকবে, তাঁরা যেন নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলেন। গণতন্ত্রের জয় হোক।
সৈয়দ শিশির : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
