কে বেশি অপরাধী? : প্রভাষ আমিন

 In খোলা কলাম

এতদিন বাংলাদেশে একজন রাজনৈতিক নেতার নামের আগেই ‘মজলুম’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো- মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ইদানিং দেখছি আরেকজন মানুষের নামের আগেও ‘মজলুম’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি মাহমুদুর রহমান। অনুসারীরা অবশ্য তাকে জননেতা বলেন না, বলেন ‘মজলুম সাংবাদিক’।

এখানেই আমি দ্বিধায় পড়ে যাই। মাহমুদুর রহমান কি আসলে নেতা না সাংবাদিক? গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মাহমুদুর রহমানের মুক্তি এবং হাসপাতালে ভর্তির সময় মাহমুদুর রহমানের চারপাশে সাংবাদিকের চেয়ে বিএনপি এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের ভিড় ছিল বেশি। আর মুক্তির পর তিনি যেভাবে ফুলের মালা নিয়ে খোলা জিপে চড়ে এসেছেন; তা সাংবাদিকসুলভ নয়, নেতাসুলভ।

মাহমুদুর রহমানের সাথে আমার মতের চরম অমিল। তবে ভিন্নমতে আমার কখনোই আপত্তি নেই। আমি সবসময় ভিন্নমতকে স্বাগত জানাই। তবে মাহমুদুর রহমানকে ‘মজলুম সাংবাদিক’ বলতে আমার একটু আপত্তি আছে। তিনি টাকার জোরে সম্পাদক হয়েছেন। সাংবাদিকতায় তার প্রথম পদ সম্পাদক।

তিনি বিভিন্ন সময়ে তার সম্পাদিত পত্রিকা ‘আমার দেশ’এ সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখেছেন। আমার কোনো আপত্তি নেই। অনিয়মের বিরুদ্ধে বস্তুনিষ্ঠ লেখা প্রকাশ সাংবাদিকদের দায়িত্ব। কিন্তু ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার লঘুদণ্ডের পর শাহবাগে যে স্বতস্ফুর্ত গণজাগরণ ঘটেছিল, মাহমুদুর রহমান তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাতেও আমার আপত্তি ছিল না। আমিসহ গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে তখন দেশের কোটি মানুষ অবস্থান নিয়েছিল। তাই বলে গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধিতা করা যাবে না, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধিতা করা আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো এক কথা নয়।

গণজাগরণ মঞ্চকে হেয় করতে মাহমুদুর রহমান যেভাবে দিনের পর দিন সাংবাদিকতার সব নীতি-নৈতিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা ছিল লজ্জার। সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানকে তিনি রীতিমত ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানে শর্তসাপেক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া আছে। কিন্তু মাহমুদুর রহমান সব শর্ত উপেক্ষা করে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চরম অপব্যবহার করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাটাকেই দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিলেন।

গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে নাস্তিক্যের ট্যাগ লাগানোর একক ‘কৃতিত্ব’ মাহমুদুর রহমানের। খুঁজে খুঁজে ব্লগারদের ইসলাম বিদ্বেষী লেখা ব্লগের ছোট পরিসর থেকে মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশের দায় পুরোটাই মাহমুদুর রহমানের। ব্লগে ইসলাম বিদ্বেষী লেখা যদি অপরাধ হয়, তাহলে তা মূলধারার গণমাধ্যমে পুনঃপ্রকাশ অপরাধ হবে না কেন?

হেফাজতে ইসলামকে উস্কে দেয়ার দায়ও অনেকটাই মাহমুদুর রহমানের। অবশ্য অনেকে একে দায় না বলে কৃতিত্ব হিসেবে বাহবা দিয়েছেন। তখন মাহমুদুর রহমান দিনের পর দিন তার পত্রিকায় সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিতেন। আর থাকতেন পত্রিকা অফিসে। ভাবখানা এমন ছিল, সাহস থাকলে একজন সম্পাদককে তার অফিস থেকে গ্রেপ্তার করো।

দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থেই তখন মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা ছিল সময়ের দাবি। দেরিতে হলেও সরকার তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। ভিন্নমতের হলেও দিনের পর দিন বিনা বিচারে তার কারাভোগের বিরোধিতা করেছি আমি। এখনও অপসাংবাদিকতা করার দায়ে, সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়ার দায়ে প্রচলিত আইনে তার বিচার চাই।

সাড়ে তিন বছর কারাভোগের পর মাহমুদুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। মুক্ত বাংলাদেশে তাকে স্বাগত। আশা করি, তিনি সব দলের, সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবেন। তার কলমের লক্ষ্য নিছক একটি দল আর একটি আদর্শ হবে না। আরো প্রত্যাশা, তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতার পার্থক্যটা বুঝবেন। যার পক্ষে বা বিপক্ষেই লিখুন না কেন, সাংবাদিকতাটা করবেন বস্তুনিষ্ঠতার নিরিখে।

এক মাহমুদুর রহমান মুক্তি পেলেও আরেক মাহমুদুর রহমান মান্না এখনও কারাভোগ করছেন। ঢাকার সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার সাথে একটি টেলিফোন আলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাশ ফেলার ষড়যন্ত্র করার অপরাধে কারাভোগ করছেন সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না।

বাংলাদেশে কত মানুষ লাশ ফেলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ চৌধুরীকে হত্যা করে ফাঁস লাগানো হয়। খাটে পা ঠেকে থাকলে কেউ ফাঁসিতে আত্মহত্যা করতে পারে না, এইটুকু বোঝার মত জ্ঞান সবারই আছে, খালি পুলিশের নেই। এই যখন বাংলাদেশের অবস্থা, মানুষ খুন হয়ে যাচ্ছে, গুম হয়ে যাচ্ছে, লাশ ভাসছে পানিতে; তখন শুধু টেলিফোনে লাশ ফেলার ষড়যন্ত্র করার দায়ে কারাভোগ করছেন অসুস্থ মাহমুদুর রহমান মান্না।

বারবার তার মুক্তির দাবি উঠলেও, সরকার তা কানে তুলছে না। আমি বুঝতে পারছি না, সরকারের বিবেচনায় কার অপরাধটা বেশি, মাহমুদুর রহমানের না মাহমুদুর রহমান মান্নার?

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
probhash2000@ gmail. com

সূত্র : পরিবর্তন.কম।

Recent Posts

Leave a Comment