তবে ঢাকা শহরের গৃহপরিচারিকাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও রয়েছে বাড়ির মালিক এবং মেসের সদস্যদের। এ বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিহাবুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রায় ৪ বছর ঢাকার বিভিন্ন মেসে থেকেছি। আসলে এই শহরের বুয়ারা (গৃহপরিচারিকা) তো খুবই ব্যস্ত! তারা একসঙ্গে তিন-চারটা বাসায় কিংবা মেসে রান্না করে। রান্না করতে এসে তাড়াহুড়া করে, আরেক জায়গায় রান্না করতে জাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে যায়। মাসে অনেক দিনই এরা বিভিন্ন অজুহাতে রান্না করতে আসে না। ফাঁকি দেয়।’
আমাদের দেশে গৃহপরিচারিকাদের কাজের ধরন অনুযায়ী বেতন নির্ধারিত নয়। তবে একজনের রান্নার কাজ করে কতো টাকা কিংবা একটি ছোট পরিবারে রান্নার কাজে কতো টাকা বেতন নেবেন তার একটা প্রচলিত মানদণ্ড দাঁড় করিয়ে ফলেছেন ঢাকা শহরের গৃহপরিচারিকারা। এমনকি তারা সুনির্দিষ্ট কাজের বাইরে বাড়তি কোনো কাজ টাকা ছাড়া করেন না।
এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকর্মী মেহেদী হাসান জানান, ‘আমার স্ত্রী আর ছোটভাইকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীতে একটি ভাড়া বাসায় থাকি। একবেলা রান্নার জন্য বুয়াকে ১৫০০ টাকা দিতে হয়। রান্না করার বাইরে তাকে একটু ঘর ঝাড়ু দিতে বললে বুয়া সে কাজ করে না। এই শহরের বুয়ারা খুবই পেশাদারি। তারা প্রত্যেকটা কাজের জন্য আলাদা আলাদা টাকা হিসাব করে নেয়। আসলে এই শহরের গৃহপরিচারিকারা ভালোই আছে। এই শহরে গার্মেন্টসকর্মীরাও গৃহপরিচারিকাদের থেকে বেশি কষ্ট করে টাকা উপার্জন করে।’
ঢাকার গৃহপরিচারিকাদের মধ্যে বেতনকেন্দ্রিক ‘জোট’ আছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে রাজধানীর শ্যাওড়াপাড়ায় মেসে থাকা ছাত্র তারেক উদ্দিন মাহমুদ জানান, এলাকার বুয়াদের মধ্যে জোট আছে। কোনো বুয়া বেতন বাড়ালে অন্য মেসের বুয়াও বেতন বাড়িয়ে ফেলে। বাড়তি বেতন না দিতে চাইলে তারা কাজ ছেড়ে দেয়। পরে যখন নতুন বুয়া রাখতে যাই তখন দেখা যায়, সেও বাড়তি বেতন দাবি করে।
তারেক আরও জানান, ঢাকায় এমন অনেক গৃহপরিচারিকা আছেন যারা এখানে উপার্জন করা টাকা দিয়ে গ্রামে দালান গড়েন। তবে এটাও ঠিক যে অনেক গৃহপরিচারিকা খুবই গরিব যাদের দিন কাটে দুর্দশায়।
সার দেশে বর্তমানে কতো গৃহকর্মী তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১০ সালের লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য অনুযায়ী সার দেশে গৃহকর্মীদের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ, যাদের বেশির ভাগই নারী এবং শিশু। গৃহকর্মে নিযুক্ত এই ব্যাপকসংখ্যক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও কল্যাণার্থে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ২০১৫ সালে প্রণীত ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
দেশের শ্রম আইনের আলোকে প্রণীত এই নীতিতে গৃহপরিচারিকাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের সুরক্ষা, কল্যাণ, অবকাশ, বিনোদন, ছুটিসহ তাঁদের সুষ্ঠু ও মর্যাদাসম্পন্ন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি মনিটরিং সেল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। কোনো গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের শিকার হলে মনিটরিং সেলে মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। সেই সঙ্গে ওই নীতিতে গৃহপরিচারিকা নিয়োগকারীদের জন্যেও কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। কোনো গৃহপরিচারিকা বাসার মালামাল নিয়ে গেলে কিংবা বাসার কোনো শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি বা বৃদ্ধদের ওপর নির্যাতন, অবহেলা বা পীড়াদায়ক আচরণ করলে গৃহপরিচারিকা নিয়োগকারী আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন।