পরকীয়া প্রেমে স্বামীকে খুন করার জের : খুনি স্ত্রী ও প্রেমিকের মৃত্যুদন্ড

 In চাঁদপুর, জাতীয়
ঘৃণ্যতম পরকীয়া প্রেমের কারণে স্বামীকে খুন করলো স্ত্রী। সাথে সহযোগী ছিলো পরকীয়া প্রেমিক। আর এ নৃশংসতম হত্যাকান্ডের শাস্তিস্বরূপ বিচারের রায় দেয়া হলো খুনি স্ত্রী ও পরকীয়া প্রেমিকের মৃত্যুদন্ড। যুগান্তকারী দৃষ্টান্তমূলক এ রায় দিলেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মামুনুর রশীদ। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত এ দু ঘাতক হচ্ছে চাঁদপুর সদর উপজেলার উত্তর বিষ্ণুপুর গ্রামের মোঃ কামাল হোসেন গাজীর মেয়ে (নিহত কলমতর গাজীর স্ত্রী) শিল্পী বেগম (৩২) ও তার পরকীয়া প্রেমিক বিষ্ণুপুর গ্রামের গাজী বাড়ির মোখলেছুর রহমান গাজীর ছেলে কবির গাজী (২৮)। গতকাল ২৮ নভেম্বর দুপুর ১টায় চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মামুনুর রশীদ এ রায় প্রদান করেন।

আসামীদের উপস্থিতিতে বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন। রায় শোনার পরপরই শিল্পী বেগম এজলাসেই মাথা ঘুরে পড়ে যায় আর পরকীয়া প্রেমিক কবির গাজীকে অনেকটা চিন্তিত দেখা গেছে। ২০১৩ সালের ৭ জুলাই দিবাগত গভীর রাতে সৌদি প্রবাসী কলমতর গাজীকে তার নিজ ঘরেই স্ত্রী ও স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক খুন করে।

রায় ঘোষণার পর পরই পুলিশ আসামীদের প্রিজন ভ্যানে করে জেল হাজতে নিয়ে যায়। এদিকে লোমহর্ষক এ হত্যাকান্ডের রায় ঘোষণা হবে জেনে গতকাল আদালত প্রাঙ্গণে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায়। রায় শোনার পর পরকীয়ার প্রেমিক যুগলকে দেখার জন্যে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এজলাস থেকে পুলিশ আসামীদের বের করে আনার সময় উৎসুক জনতা তাদের ধিক্কার জানায়।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের ছমিদ গাজীর ছেলে কলমতর গাজী সৌদি আরব থাকতেন। ঘটনার ৩ মাস পূর্বে তিনি দেশে আসেন। তার অনুপস্থিতিতে স্ত্রী শিল্পী বেগমের সাথে তার মেয়ের গৃহশিক্ষক (সম্পর্কিত খালাতো ভাই) কবির গাজীর পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। শিল্পী বেগমের সাথে যোগাযোগ রাখতে কবির গাজী তাদের বাড়ির সামনে একটি টং দোকান পেতে বসে। এই দোকানে থেকে প্রায় সে শিল্পীর সাথে রাত্রিযাপন করতো আবার ভোরে দোকানে এসে ঘুমিয়ে থাকতো। কলমতর গাজী দেশে আসার পর স্ত্রীর সাথে কবির গাজীর পরকীয়া প্রেমের ঘটনা জানলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ দেখা দেয়। এ কারণে স্ত্রী শিল্পী তার প্রেমিকসহ পরিকল্পনা করে স্বামীকে মেরে ফেলার। এরপর ২০১৩ সালের ৭ জুলাই দিবাগত রাতে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকান্ড ঘটায়। কলমতর গাজী নিজ ঘরেই ঘুমিয়ে ছিলো। আর তখন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্ত্রী শিল্পী বেগম ও তার প্রেমিক কবির গাজীসহ ঘুমন্ত অবস্থায় কলমতর গাজীর মুখে বালিশ চাপা দিয়ে তার বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করে তাকে খুন করে। পরে ওই রাতেই তাকে ঘরের পাশেই মাটি চাপা দিয়ে রাখে। এদিকে স্বামীকে মেরে ১০ জুলাই শিল্পী বেগম নিজেই স্বামী নিখোঁজ হয়েছে মর্মে চাঁদপুর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। কিন্তু পুলিশের সন্দেহ হলে পরের দিন পুলিশ শিল্পী বেগমকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মূল ঘটনা বেরিয়ে আসে। পরে কবির গাজীকেও আটক করা হয়। এ ঘটনায় নিহত কলমতর গাজীর ছোট ভাই লিটন গাজী ২০১৩ সালের ১১ জুলাই বাদী হয়ে ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় চাঁদপুর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ১৫। এ মামলায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে শিল্পী বেগম ও প্রেমিক কবির গাজী স্বীকার করে তারা দু’জনে মিলে ৭ জুলাই রাত ১টার দিকে কলমতর গাজীকে শ্বাসরোধ করে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনার ৩ মাস আগে কলমতর গাজী ছুটিতে সৌদি আরব থেকে বাড়িতে আসেন। কবির গাজী তার মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতো। কলমতর গাজীর ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে।

সরকার পক্ষের আইনজীবী ছিলেন অতিরিক্ত পিপি অ্যাডঃ সাইয়েদুল ইসলাম বাবু ও এপিপি অ্যাডঃ দেবাশীষ কর মধু। অতিরিক্ত পিপি অ্যাডঃ সাইয়েদুল ইসলাম বাবু জানান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চাঁদপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মানিক ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। মামলাটি ৩ বছর ৪ মাস আদালতে চলমান থাকা অবস্থায় আদালত ২১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের কাছে ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় উভয় আসামীকে ৩০২ ধারায় মৃত্যুদন্ড, ২০১ ধারায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদন্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ১ বছরের কারাদন্ড প্রদান করেন।

আসামী পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডঃ আঃ ছাত্তার ও অ্যাডঃ মনোয়ারুল ইসলাম।

Recent Posts

Leave a Comment