মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকটা নাকের ডগায় বসে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে কিউবায় কমিউনিস্ট শাসন ধরে রেখেছিলেন ক্যাস্ত্রো। ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা হয়েছে অনেক বার। প্রাণহানির চেষ্টাও হয়েছে। তাঁর ৪৯ বছরের ক্ষমতায় ১০ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে শপথ নিয়েছেন। ক্যাস্ত্রোকে সরাতে পারেননি কেউই। ক্যাস্ত্রোর অবসরের পরও কিউবা শাসন করছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টি। বয়সজনিত অসুস্থতায় গত আট বছর ধরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে চলে গিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে সরে দাঁড়ান কিউবার প্রেসিডেন্ট পদ থেকে। ফিদেলের জায়গায় দায়িত্ব নেন তাঁরই ভাই রাউল ক্যাস্ত্রো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়ায় যে সব কমিউনিস্ট নেতা বিশ্ব রাজনীতিতে প্রবলভাবে আলোচিত ক্যাস্ত্রো তাঁদের অগ্রগণ্য। ১৯২৬ সালের ১৩ অগস্ট কিউবার এক ব্যবসায়ী পরিবারে ফিদেলের জন্ম। ২১ বছর বয়সেই বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ‘আমেরিকার পুতুল’ বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটিয়ে কিউবার ক্ষমতায় আসে ফিদেলের দল। এই বিপ্লবে ক্যাস্ত্রোর প্রধান সহযোগী ছিলেন আর এক কিংবদন্তী চে গুয়েভারা। বিপ্লবের সংগ্রামে ছিলেন ফিদেলের ভাই এবং কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাউলও।
২০০৮ সালে ভাই রাউলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে টানা প্রায় ৫০ বছর তিনি কিউবা শাসন করেছেন। তার সমর্থকরা বলেছেন, ক্যাস্ত্রো কিউবাকে জনগণের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দির এ মহানায়ক, বিশ্বব্যাপী মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদের জয়জয়কারের মধ্যেও সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে টিকিয়ে রেখে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রবাদ পুরুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় ভরা। মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেছেন অসংখ্যবার। কখনও ভয় পাননি। মাথা নত করেননি। আমৃত্যু সমাজতান্ত্রিক আদর্শের লাল ঝাণ্ডাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন।
১৯৪৭ সালে নবগঠিত কিউবান পিপলস পার্টিতে যোগ দেন ক্যাস্ত্রো। মার্কিন ব্যবসায়ী শ্রেণি ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবিচার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নিম্ন মজুরীর অভিযোগ নিয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে তুখোড় বক্তা ক্যাস্ত্রো দলের তরুণ সদস্যদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
চরম দুঃসাহসী ক্যাস্ত্রো বিপ্লবের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব এ সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মাত্র ১২৩ জন নারী পুরুষের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে ১৯৫৩ সালে মনকাডা আর্মি ব্যারাকে হামলা করেন। সংঘর্ষে মাত্র ৮ জন নিহত হলেও ক্যাস্ত্রোর দল পরাস্ত হয় এবং তার প্রায় ৮০ জন সহযোদ্ধাকে হত্যা করা হয় বাতিস্তার নির্দেশে।
ক্যাস্ত্রোকে আটককারী লেফট্যানেন্ট ‘বিদ্রোহীদের আটক করা মাত্র হত্যা করার নির্দেশ’ উপেক্ষা করে তাকে বেসামরিক কারাগারে পাঠিয়ে দিলে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। কিন্তু কারাগারে তাকে বিষ খাইয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। এবার দায়িত্ব ছিল ক্যাপ্টেন পেলেতিয়ারের ওপর। তিনি দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বরং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন। কোর্ট মার্শালে ফাঁসি দেওয়া হয় ক্যাপ্টেন পেলেতিয়ারকে। কিন্তু বিশ্ব জনমতের কথা বিবেচনা করে ক্যাস্ত্রোকে হত্যা না করে বিচারের মুখোমুখি করেন বাতিস্তা।
মনকাডা হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ফিদেল যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তা পরবর্তীতে ‘হিস্ট্রি উইল অ্যাবসোল্ভ মি’ বা ‘ইতিহাস আমার পাপমোচন করবে’ নামে একটি বই আকারে বের হয়। ওই দীর্ঘ বক্তৃতার মধ্য দিয়ে কিউবার রাজনৈতিক সংকট এবং তার সমাধানের পথ নির্দেশ করেন তিনি। এতে রাতারাতি দেশব্যাপী বিখ্যাত হয়ে উঠেন এবং জননায়কে পরিণত হন ক্যাস্ত্রো। বিচারে তার ১৫ বছরের কারাদণ্ড হলেও প্রবল জনমতের কাছে মাথা নত করে দু’বছরের মাথায় তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন বাতিস্তা।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিপ্লবী দল গড়ার লক্ষ্যে মেক্সিকোয় পাড়ি জমান ফিদেল। সেখানে একটি গেরিলা দল গঠন এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়ের পর চে গুয়েভারা, জুয়ান আলমেইডা এবং অন্যান্যদের মিলিয়ে প্রায় ৮০ জনের একটি বিপ্লবী দল নিয়ে ১৯৫৬ সালে কিউবায় ফিরে আসেন।
সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতে নিজেদের ঘাঁটি গাড়ার লক্ষ্যে এগোনোর সময়ই বাতিস্তার সেনাদের আক্রমণের মুখে পড়েন তারা। সম্মুখ সমরে নিহত হয় বেশিরভাগ গেরিলা। মাত্র ১২টি অস্ত্র আর ১৬ জন গেরিলা নিয়ে শেষ পর্যন্ত নিরপদে ঘাঁটি গাড়তে সক্ষম হন ক্যাস্ত্রো।
স্থানীয় দরিদ্র জনগণের আশ্রয় নিয়ে ধীরে ধীরে দল বাড়াতে থাকে আর সেনা চৌকিগুলোতে চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে অস্ত্রশস্ত্র যোগাড় করতে থাকে জুলাই টোয়েন্টি সিক্স মুভমেন্ট। বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ-যুবা-ছাত্র এ আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে। ১৯৫৮ সালে এসে কিউবার মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও সমর্থন লাভ করেন ক্যাস্ত্রো। ওই বছর আইনজীবী, চিকিৎসক, স্থপতি, হিসাবরক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার ৪৫টি পেশাজীবী সংগঠন যুক্তভাবে এক খোলা চিঠিতে জুলাই টোয়েন্টিসিক্স মুভমেন্টকে সমর্থন জানায়।
ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে ক্যাস্ত্রোর গেরিলা বাহিনী। ক্যাস্ত্রোর গেরিলারা সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বত ছেড়ে একের পর এক শহর দখল করতে থাকে। স্থানীয় জনতা গেরিলাদের অভ্যর্থনা জানায়। ১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি বাতিস্তার প্রায় ১,০০০ সেনা গেরিলাদের হাতে প্রাণ হারালে যুক্তরাষ্ট্র বিমান, বোমা, জাহাজ ও ট্যাংক পাঠিয়ে গেরিলাদের হঠানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু নাপাম বোমার মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও গেরিলাদের সঙ্গে বাতিস্তা পেরে না ওঠায় তাক নির্বাচন দেওয়ার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৫৮ সালের মার্চে বাতিস্তা নির্বাচন দিলেও জনগণ সে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ৭৫ ভাগ থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও ৯৮ ভাগ মানুষ ভোটকেন্দ্রেই যায়নি। ফিদেলের সেনারা চারদিক থেকে রাজধানী হাভানাকে ঘিরে ধরতে শুরু করলে ১৯৫৯ সালের পহেলা জানুয়ারি নববর্ষের দিনে কিউবা ছেড়ে পালান জেনারেল বাতিস্তা। এরপর সেনাবাহিনীর অন্য সিনিয়র জেনারেলরা আরেকটি সামরিক সরকার গঠনের চেষ্টা চালান। কিন্তু ক্যাস্ত্রোর অনুগত জনস্রোতের কাছে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয় সেনাবাহিনী। ১৯৫৯ সালের ৯ জানুয়ারি রাজধানী হাভানায় ঢুকে দেশের নিয়ন্ত্রণভার নিয়ে নেয় ফিদেল ক্যাস্ত্রোর গেরিলারা।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সকল শিল্প কারখানা জাতীয়করণ করেন এবং সমবায়ভিত্তিক কৃষি চালু করেন। একই সঙ্গে আমেরিকান মালিকানাধীন খামার ও ব্যবসার মালিকানা গ্রহণ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করেন। এসব কারণে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক অনেক তেতো হয়ে যায়। আমেরিকা তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিউবার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়ার লক্ষ্যে একটি টোটাল বাণিজ্য অবরোধ ঘোষণা করা হয় ১৯৬২ সালে। ক্যাস্ত্রোকে হত্যা করার জন্য বছরের পর বছর আমেরিকা কয়েকশত প্রচেষ্টা চালায় এবং প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা নাটকীয়ভাবে ব্যর্থ হয়।
সোভিয়েত সাহায্যে নির্ভরশীলতার কারণে ১৯৯১ সালে সোভিয়েতের পতনের পর কোনঠাসা হয়ে পড়েন ক্যাস্ত্রো। আমেরিকার চলমান দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের কারণে ১৯৯০ এর দশকে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে কিউবা। তারপরও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য বজায় থাকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ২০০৮ সালে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন এবং রাউলের কাছে পুরোপুরি দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।
ফিদেল ক্যাস্ত্রো এক জীবন্ত কিংবদন্তী বিপ্লবীর নাম। আমেরিকার চক্ষুশূল হয়ে আমেরিকার কোলে বসেই সবাইকে মোকাবেলা করেছেন ক্যাস্ত্রো। সিআইএ’র রিপোর্টেই তাকে ২৫ বার হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ, কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট সবকিছু নিজে কঠোর হাতে মোকাবেলা করেছেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বিভিন্ন নিপীড়িত জাতির প্রতি সহযোগিতার মনোভাবের বিন্দুমাত্র কোনো কমতি ছিল না তার মধ্যে। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছেন। ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তিসংগ্রামকে উৎসাহ যুগিয়েছেন।তিনি ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশকেই মার্কিন প্রভাব থেকে বের করে এনেছেন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে নিজের পিতা বলে সম্বোধন করতেন। ভেনেজুয়েলার চিকিৎসা-শিক্ষা প্রসারে কিউবার স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অনন্য সাধারণ এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। সারা জীবন তিনি লড়েছেন মার্কিন তথা পুঁজিবাদী বিশ্বের বিরুদ্ধে-প্রচার করেছেন সাম্যের বাণী। মার্কিন রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজ দেশ কিউবাকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
এই মহান নেতার প্রয়াণে বিশ্ব হারাল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এক মহান জননেতাকে। মুক্তিকামী মানুষ হারাল তাদের অনন্ত প্রেরণার উৎসকে।
পরিশেষে বিপ্লবী ক্যাস্ত্রোর প্রতি জানাই শ্রদ্ধা। কমরেড, লাল সালাম। বিপ্লব দীর্ঘজীবীব হোক।
চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।
chiroranjan@gmail.com