গত ২৪ মে ৫৪ ও ১৬৭ ধারা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল খারিজ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেন ‘গাইড লাইনসহ’ কিছু ‘মডিফিকেশন’ থাকবে রায়ে।
ওইদিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। আর রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টর এম আমীর-উল ইসলাম ও ব্যারিস্টার সারা হোসেন।
উল্লেখ্য যে, ১৯৯৮ সালে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করার পর ওই বছরের ২৩ জুলাই মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশ-কার্যালয়ে তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। তদন্ত শেষে কমিটি ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের পক্ষে কয়েকটি সুপারিশ করে।
তবে পরবর্তীতে সেইসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে।
ওই রিট আবেদনের শুনানি শেষে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট এই বিষয়ে কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন।
হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনাগুলো-
ক. আটকাদেশ দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না।
খ. কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে।
গ. গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে।
ঘ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেফতার ব্যক্তির নিকট আত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিষয়টি জানাতে হবে।
ঙ. গ্রেফতার ব্যক্তিকে তার পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী ও আত্মীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে।
চ. গ্রেফতার ব্যক্তিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে কারাগারের ভেতরে কাচের তৈরি বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ওই কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকট আত্মীয় থাকতে পারবেন।
ছ. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে।
ট. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিকেল বোর্ড গঠন করবে। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নেবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে।
হাইকোর্টের ওই রায়ে ছয় মাসের মধ্যে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে প্রচলিত বিধি সংশোধন করার পাশাপাশি ধারা সংশোধনের আগে নির্দেশনাগুলো সরকারকে অনুসরণ করতে বলা হয়। তবে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের দেওয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলে ২০০৪ সালে তা মঞ্জুর করা হয়। তবে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনাগুলো ওই সময় স্থগিত করা হয়নি।
এরপর বিগত বছরগুলোতে ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের বিষয়টি কয়েকবার শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এলেও শুনানি পর্যন্ত গড়ায়নি।
সর্বশেষ গত ২২ মার্চ আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়। এবং গত ১৭ মে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ বিষয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি নিয়ে ২৪ মে রায় ঘোষণা করেন।