উচ্ছেদ না হবার অধিকারই স্বাধীনতা

 In খোলা কলাম

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, করেছে জেলা প্রশাসনও। কিন্তু ঘটনার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের আতঙ্ক কাটেনি। চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণ করা জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় মারা গেছে তিনজন। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলার পরও স্বাভাবিক কাজে-কর্মে বাধা দেয়াসহ নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সাঁওতালরা। সহায় সম্বল হারিয়ে এক সপ্তাহ ধরে খোলা আকাশের নিচে থাকছেন সাঁওতাল পল্লীর প্রায় দুই হাজার মানুষ। অনেকেরই ঘরে খাবার ফুরিয়ে গেছে। কিন্ত হুমকির ভয়ে বাজারে বা কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। আশপাশের গ্রাম কিংবা স্বজনদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা দেয়া হচ্ছে।

গত ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে সাঁওতালসহ বেশ কিছু বাঙালিকে পুলিশ ও র্যা বের যৌথ অভিযানে উচ্ছেদ করা হয়। সাধারণ উচ্ছেদ নয়। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি। গুলিতে মারা হয়েছে, আহত করা হয়েছে বহুজনকে। নিজ দেশের পুলিশ ও প্রশাসনের তাণ্ডবে তারা স্তম্ভিত। গ্রামে আগুন লাগানোর ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে। ঘটনাস্থলে আগে থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। তাদের সামনেই আগুন দেয়া হয়েছে। তবুও পুলিশ এখন বলছে তারা জানেনা কে বা কারা আগুন দিয়েছে।গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি মহিমাগঞ্জ সুগার মিলের জন্য অধিগ্রহণ করা হয় পাকিস্তান আমলে। এলাকাটি সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম নামে পরিচিত। অধিগ্রহণের ফলে ১৫টি আদিবাসী গ্রাম ও ৫টি বাঙালি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন একটি লিখিত চুক্তি হয় যাতে লেখা ছিল, অধিগ্রহণকৃত জমিতে আখ চাষ করা হবে। আখ চাষ না হলে এসব জমি আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অধিগ্রহণের পর বেশ কিছু জমিতে আখের চাষ হয় এবং আখ দিয়ে চিনি উৎপাদন করা হয়। কিন্তু চিনিকলটি ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরে নানা সময়ে কখনো চালু হয়, আবার বন্ধ হয়। এভাবেই চলতে থাকে।

চিনিকল কর্তৃপক্ষ নিয়ম লঙ্ঘন করে অধিগ্রহণকৃত জমি বহিরাগত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ইজারা দিতে শুরু করে। অধিগ্রহণের চুক্তি লঙ্ঘন করে আখ চাষের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ধান, গম, সরষে, আলু, তামাক ও ভুট্টা চাষ শুরু হয়। সেখানকার আদিবাসী ও বাঙালি জনগণ বিষয়টি প্রশাসনকে জানায়। জনগণের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম এলাকা সরেজমিনে তদন্ত করেন। তদন্তে তিনি জমিতে ধান, তামাক ও মিষ্টি কুমড়ার আবাদ দেখতে পান। চুক্তি অনুযায়ী এসব জমি আদিবাসী-বাঙালিদের ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন চলতে থাকে, আর এর মাঝেই এই হত্যাকাণ্ড।

বিভীষিকাময় এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আমাদের ব্যথিত করে। মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের মধ্যে যারাই সেখানে গিয়েছেন তাদের মুখেই শোনা গেছে ভয়ংকর সব বর্ণনা। এ রকম একটি নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করার মতো ঘটনা বাংলাদেশে ঘটতে পারে ভাবা যায়না, বলেছেন মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। সংবাদ সম্মেলনে সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমরা যদি নিজেদের মানুষ হিসেবে মনে করি, তাহলে আরো যেসব মানুষের অধিকার হরণ হচ্ছে, তাহলে এটার বিরুদ্ধে দাঁড়াব। আমরা জোর গলায় বলতে চাই, এই মানুষেরা ঠিক যে অবস্থায় ছিল, সেই জায়গায় তাদের ফিরিয়ে আনা হোক। তাদের ত্রাণের আওতায় না এনে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। যাতে তারা যেভাবে জীবন চালাচ্ছিল, অন্তত সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারে।’

এখন সরকারি দলের প্রতিনিধিরা যাচ্ছেন। কথা বলছেন এক সময় যারা সরকারে ছিলেন তারাও। আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মানুষগুলোর বিরুদ্ধে বরাবরই দমননীতি বজায় থাকে প্রশাসনের। প্রতিটি দলই কোনো না কোনো সময় আদিবাসীদের অধিকারকে নীতিগত সমর্থন জানিয়েছে। রাজনীতিকরা প্রায়ই বলে থাকে দেশটা সবার। কিন্তু সবকিছুর তলায় জমি থেকে আদিবাসী উচ্ছেদের প্রক্রিয়াও জারি থাকে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলি আমাদের সমাজেরই প্রতিফলন। আমাদের ভেতরই থাকে এক শ্রেণীর দখলদার, যাদের হয়ে কাজ করে এই রাজনীতি।

নিজের প্রতিবেশের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করে জীবনধারণের অধিকারই প্রাণিজগতের সবচেয়ে প্রাথমিক, প্রাকৃতিক অধিকার। স্মরণাতীত কাল থেকে এই একটিমাত্র অধিকারের ওপর নির্ভর করেই মানুষের সমাজ সহজ-শান্ত-সৃষ্টিশীল জীবনযাপন করে এসেছে। প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে যথাসম্ভব রক্ষাও করেছে। জীবিকা ও জীবনযাপনের প্রধান আধার জমি। সেই আধার আর অধিকার থেকে এই মানুষগুলোকে উচ্ছেদ করার এমন নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া বলে দেয় রাষ্ট্র কতটা অমানবিক হতে পারে।

আদিবাসি বলি, আর সংখ্যালঘু বলি, কারো অধিকারের ব্যাপারেই সচেতন নই আর আমরা। গলদটা গোড়ায়। এ সমাজ তো কোনো দিনই আদিবাসিদের পদ্ধতিকে, ধ্যানধারণাকে, অভিজ্ঞতাকে মর্যাদা দিতে শেখায়নি। নিজেদের পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে আর কোনো সত্য নেই, এমনটাই ধরে নিয়েছি। তাই রাষ্ট্রকে এবং সেই সঙ্গে আমাদের সমাজও কখনো জোর গলায় স্বীকার করতে চায়না যে, আদিবাসীদের জীবনধারা, মূলধারার সঙ্গে না মিললেও তারাও নাগরিক। নিজেদের অধিকারেই নিজেদের মতো করে তারা বাঁচবেন। সেখানে রাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই হস্তক্ষেপ করার। জীবন এবং জীবিকা কেড়ে নেয়ার কোনো অধিকার নেই।

আমরা কতই না স্বাধীনতার কথা বলি। এই হলো স্বাধীনতা? সরকারি দলের যারা গেছেন দেখতে, আশা করি সফরটা লোক দেখানো হবে না। যারা জড়িত এই অন্যায়ে, ব্যবস্থা নিতে হবে। আশা করি মগজে ঢুকবে যে, বসবাসের অধিকার, অনাহারে না থাকার, উচ্ছেদ না হবার অধিকারই মানুষের স্বাধীনতা।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি।
ishtiaquereza@gmail.com

Recent Posts

Leave a Comment