আড্ডায় জন্ম কালজয়ী গান

 In জাতীয়

প্রণব ভৌমিক


মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক প্রবল সৃষ্টিশীল সময়। গানে, কবিতায়, ছবি আঁকায়, সিনেমায় বাঙালির সৃজনশীলতার শতমুখী স্ফুরণ ঘটেছিল ওই উত্তাল সময়েও। এ রকমই কিছু সাংস্কৃতিক সৃষ্টির কথা—

মুক্তিযুদ্ধ তখন সবে শুরু হয়েছে। এপ্রিলের ৪ তারিখ। ভারতের গড়িয়ায় একটি চায়ের দোকানে আড্ডা বসেছে। আলোচনার মূল বিষয় ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’। এই আড্ডাতেই জন্ম কালজয়ী একটি গানের: ‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে/ লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণী।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় গানটি শোনেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে কি? যুদ্ধের সেই দিনগুলোয় যে কটি গান মুক্তিকামী মানুষদের কঠোর সংগ্রামের পথে সাহস জোগাত, প্রেরণা দিত—এই গান সেগুলোর একটি। খ্যাতিমান গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় গানটিতে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন লোকসংগীতশিল্পী অংশুমান রায়। গৌরীপ্রসন্নর বাড়ি ছিল পাবনায়, আর অংশুমানের জন্ম ভারতের মালদহে হলেও পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজশাহীর বাসিন্দা। তাঁদের দুজনেরই বাংলাদেশ নিয়ে অন্য রকম আবেগ কাজ করত।

ভারতের কলকাতার আকাশবাণী থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠান ‘সংবাদ পরিক্রমা’র স্ক্রিপ্ট লেখক প্রণবেশ সেনের একটি লেখা থেকে জানা যায় এ গানের জন্মকথা।

প্রণবেশ লিখেছেন, এপ্রিলের সে আড্ডায় ছিলেন লোকসংগীতশিল্পী দিনেন্দ্র চৌধুরী, অংশুমান রায় ও গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। কথার পিঠে কথা জমছে। গৌরীপ্রসন্ন একটু অন্যমনস্ক, একসময় পকেট থেকে একচিলতে কাগজ বের করে লিখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর দুজনকে বললেন, ‘দেখো তো গানটা চলবে কি না?’ পড়তে পড়তেই অংশুমান বললেন, ‘গৌরীদা, এটা আপনি কাউকে দিতে পারবেন না। গানটায় সুর দেব আমি, গাইবও আমি।’ ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রায় একই কথা বলেছেন অংশুমানের ছেলে ভাস্কর রায়।

প্রথম আড্ডার কদিন পর ১৩ এপ্রিল আবার আড্ডা জমে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্ণদাস রোডের বাড়িতে। দেবদুলাল ছিলেন ‘সংবাদ পরিক্রমা’র উপস্থাপক। তাঁর বাড়িতে শিল্পী কামরুল হাসানের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন ‘সংবাদ পরিক্রমা’র প্রযোজক উপেন তরফদার। এসেছেন অংশুমানও। একসময় অংশুমান গেয়ে উঠলেন, ‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে…’। সঙ্গে সঙ্গে উপেনের টেপরেকর্ডারও চালু হলো।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে উপেনও বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময় তিনি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘(সেদিন) অংশুমান রায় কামরুল হাসানকে বাংলাদেশ নিয়ে গৌরীদার লেখা একটা গান শোনাতে চাইলেন। কিন্তু গান গাওয়ার জন্য হারমোনিয়াম-তবলা নেই। সেই বাড়ির নিচতলায় থাকতেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ঘর থেকে হারমোনিয়াম আনা হলো। কিন্তু তবলা? একটা বাঁধানো মোটা খাতার ওপর আঙুল ঠুকে দিব্যি সেটাকে তবলা বানিয়ে ফেললেন দিনেন্দ্র চৌধুরী। গান গাওয়া হলো। রেকর্ডও করা হলো।’

আড্ডার শেষে উপেন ও অংশুমান চলে গেলেন আকাশবাণীতে। প্রণবেশকেও ডেকে নিলেন। ঠিক হলো, উপেনের রেকর্ড করা গানটির ‘বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ’ কথাটা যখন ফিরে আসবে, তখন ইন্টারলুডে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের কিছু অংশ ইনসার্ট করা হবে।

একটি ‘সংবাদ পরিক্রমা’য় ও ‘সংবাদ বিচিত্রা’য় গানটি ব্যবহৃত হলো। পরের দিন তুমুল হইচই পড়ে গেল। প্রণবেশ একই লেখায় লিখেছেন, ‘কুষ্টিয়া অঞ্চলের একদল মুক্তিসংগ্রামী এসে গানটির জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। বলেন, তাঁদের যখন হতাশায় ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন এই গানটি মৃতসঞ্জীবনীর কাজ করেছে।’

পরে হিন্দুস্তান রেকর্ড এই গানটি এলপি আকারে বের করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক হয়, রেকর্ডের এক পিঠে থাকবে অংশুমানের গানটি। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, অন্য পিঠে কী থাকবে? এই বিপদ থেকে গৌরীপ্রসন্নই উদ্ধার করলেন। সুর ঠিক রেখে তিনি লিখে দিলেন গানটির ইংরেজি সংস্করণ। তখন মঞ্চে ইংরেজি গান গাইতেন করবী নাথ নামে একজন শিল্পী। ‘মিলিয়ন মুজিবরস সিংগিং’ গানটি তিনিই গাইলেন। ভারত ও পরে স্বাধীন বাংলাদেশে গানটির রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল প্রচুর পরিমাণে।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার গৌরীপ্রসন্ন ও অংশুমানকে ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যেই ঘটে ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তন। তাই সে সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়িত হয় না। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁদের দুজনকে দেয় ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’।

Recent Posts

Leave a Comment