জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাকিম মুন্সী
বিজয়ের মাসে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দুঃসহ বেদনার কথা জানতে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় একটি ঝুপড়ি ঘরে তিনি রাত্রি যাপন করেন। তিন ছেলে একটি টিনের ঘর তৈরি করলেও সেখানে স্ত্রী, মেয়ে ও তার সন্তানকে নিয়ে থাকছে। ফলে হাঁস মুরগীর ঘরের মতো ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরই তার রাতযাপনের সম্বল। ‘দেশের বীর সন্তানকে যদি এভাবে বাস করতে হয়, তবে তারা কিসের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন’ এ কথা জানতে চাইলে এক বুক কষ্ট নিয়েও হেসে উঠেন। তিনি বললেন, গত ৩৯ বছর যেভাবে জীবনের ঘানি টেনে চলছি, তাতে মাঝে মাঝে দুঃখ হয় এজন্যেই কি যুদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু আবার মনকে বোঝাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার একদিন বাস্তব রূপ দেখবো এবং সেদিন অবশ্যই আমিও সুখের ছোঁয়া পাবো।
আব্দুল হাকিম জানান, ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ বিভাগের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষ হলেও তিন মাস ধরে তাদেরকে বাহিনীতে নিয়মিত না করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে শুধু অস্ত্র পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত রাখা হয়। সেই অবস্থায়ই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর নৃশংসতা থেকে বাঁচতে কোনো রকমে ব্যারাক থেকে পালিয়েছেন। পরে হেঁটে বাড়ি চলে আসেন। সেখান থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে চলে যান। ভারতের হাঁপানিয়া ক্যাম্পে পৌঁছলে ট্রেনিং প্রাপ্ত হিসেবে তাকে মেলাঘর ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে সংগঠিত হয়ে বর্ডার এলাকায় সালদা নদীর যুদ্ধ, বেলুনিয়া বর্ডার যুদ্ধ এবং সর্বশেষ মেজর গাফ্ফারের নেতৃত্বে নির্ভয়পুরে সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নেন। ৭দিনের ভয়াবহ যুদ্ধ শেষে পাকবাহিনী তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় ফিরে মিরপুরে বিহারীদের সাথে আবারো এক মাসের যুদ্ধে তিনি অংশ নেন।
পরে তিনি সেনাবাহিনীর ৪ বেঙ্গল রেজিমেন্টে জয়দেবপুরে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবে অনেকের মতো তারও কপাল পোড়ে। মেজর খালেদ মোশারেফের বাড়ির গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তাকে সেনা বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। ১৯৭৭ সালে তাকে শূন্য হাতে বিদায় করে দেয়া হয়।
শুরু হয় তার কষ্টের জীবন। এক বছর পূর্বে বিয়ে করা নববধূকে নিয়ে শুরু হয় দুঃখ ভরা জীবন। ঢাকায় রিঙ্া চালানো শুরু করেন তিনি। ৩ ছেলে ২ মেয়ে ও স্ত্রীকে তিনি রিঙ্া চালিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার মুখে তুলে দিতে পারলেও শিক্ষার আলো জ্বালতে পারেন নি। ফলে তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে এখন এলাকায় সিএনজি স্কুটার চালক, এক ছেলে ঢাকায় চটপটি বিক্রি করে এবং ছোট ছেলে ঢাকায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিলেও এক মেয়ে এখন ঘাড়ের ওপর।
তিনি জানান, বয়সের ভারে আর রিঙ্া চালাতে না পেরে এক দশক পূর্বে বাড়ি চলে আসেন। সেখানে একটি পুরানো মিশুক কিনে তা চালিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু সেটিও এখন নষ্ট। ফলে সংসার চালানোর জন্য একমাত্র ভরসা মুক্তিযোদ্ধার মাসিক সম্মানিটুকু। মেয়ে ও দুই নাতি এবং স্ত্রী একটি ভাঙ্গা টিনের ঘরে থাকলেও তিনি থাকেন একটি ঝুপড়ি ঘরে।
তার স্ত্রী মাফিয়া বেগম জানালেন, বিনা অপরাধে চাকরি চলে যাবার পর হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটেছেন তার স্বামী। জীবনের এই কঠিন সংগ্রামে তিনি তাকে ছেড়ে যান নি। তিনি বলেন, সামান্য একখ- জমিতে ভাঙ্গা ঘর। বসতবাড়ি নির্মাণের সাহায্য চেয়ে আবেদন করলেও সেই আবেদন এখনো অপক্ষোর প্রহর গুণছে। ফরিদগঞ্জে সরকারিভাবে বসত বাড়ি নির্মাণের জন্য ১০ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা পাঠালেও সেই তালিকায় অসহায় আবদুল হাকিমের নাম নেই। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন বলেন, আর কতটা অসহায় হলে আমার স্বামীর নাম সেই তালিকায় ঠাঁই পাবে?