বাবার সন্ত্রাসে রক্তাক্ত শাওনের কান্না

 In প্রধান খবর

বাবার সন্ত্রাসে রক্তাক্ত শাওনের কান্না

এ যেন বাংলা সিনেমার ভিলেনদের সেই নিষ্ঠুরতাকেও হার মানানো এক গল্প! জন্মদাতা বাবা যে কিনা শত বিপদে সন্তানকে আগলে রাখবে, সে-ই মাস্তান দিয়ে সন্তানকে মার খাওয়ালো! চাঁদা চেয়ে হুমকি দিলো! বিস্ময়কর হলেও এমনই ঘটনা ঘটেছে। আর এমন ঘটনার শিকার বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে বিশ্বকাপে মাঠ মাতানো ক্রিকেটার সালেহ আহমেদ শাওন। যাকে হোম অব ক্রিকেটের দর্শকরা শাওন গাজী নামেই চেনে।

গত যুব বিশ্বকাপে মেহেদী হাসান মিরাজের সতীর্থ ছিলেন শাওন। আর এখন জাতীয় লিগ খেলার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত পটুয়াখালীর ১৯ ছাড়ানো এই অলরাউন্ডার। সন্ত্রাসীদের আক্রমণে আহত হয়ে তার হাসপাতালে ভর্তির খবরটি গত দু’তিন দিন ধরে ভেসে বেড়াচ্ছিল ক্রিকেটাঙ্গনে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলছিলেন অনেকেই। এটা কী করে হয়, বাবা কেন তার সন্তানকে ভাড়াটে মাস্তান দিয়ে মারতে যাবেন?

রোববার যুব দলের সাবেক এই ক্রিকেটার অকপটে জানালেন, ‘দেখুন, পুরো ঘটনাটি ঘটিয়েছেন আমার বাবা মতি গাজী। যিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে আমার মাকে রেখে চলে গেছেন। আমি বড় হয়েছি মামা বাড়িতে। এখন ক্রিকেট খেলে কিছু টাকা আয় করছি, সেটা উনার পছন্দ হচ্ছে না। সেই টাকার ভাগ চাইছেন। না দেয়াতে মাস্তান ভাড়া করে উনি আমাকে মার খাইয়েছেন। ইট দিয়ে আমাকে এমন করে আঘাত করা হয় যে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।’

মতি গাজী’র এমন কাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে অশ্রুসজল হয়ে ওঠেন যুব বিশ্বকাপে ১২ উইকেট নেয়া এই স্পিনার। পুরো ঘটনা শুনুন শাওনের মুখ থেকেই, ‘কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সঙ্গে আমার ৯ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। তার কিছু অংশ নিয়ে এবার এলাকায় গিয়েছিলাম। যা কিছু মানুষ জেনে যায়। যারা সবসময় আমার কাছে চাঁদা চাইত। শুধু আমি নই, সবার কাছেই ওরা চাঁদা দাবি করে। দেখুন আমি তো একজন ক্রিকেটার।  আমি তো আর আওয়ামী লীগ, বিএনপি না। নিজে কষ্ট করে টাকা আয় করি। আমি কেন তাদের টাকা দেব, বলেন? এবার পটুয়াখালীতে আসার পর ওরা আমার কাছে টাকা চায়। আমি সরাসরিই তাদের না করে দেই। এরপরই তারা আমাকে রাস্তায় ফেলে মারধর করে। তারা তিনটি মটরসাইকেলে প্রায় ১১-১২ জনের মতো ছিল। আমি তাদের চার-পাঁচ জনকে চিনতে পারি। আমার কাছে যে টাকা চেয়েছিল তার নাম রনি।’

শাওন জানান, তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল সন্ত্রাসীরা। বলছিলেন, ‘পটুয়াখালীর খলিফাখালী এলাকাতে একটা মটরসাইকেল থেকে রনি নেমে একটা ইট দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি দেয়। আমার মাথা ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। এরপর রফিক এসে আমার মাথায় একটা বাড়ি দেয়। রফিক, রুবেল, নুর আলম এরা ছিল। সৌরভ আমাকে চেপে ধরে। তারা আমার আইফোন সিক্স এস ও নগদ সাত হাজার টাকা কেড়ে নেয়।’

সেই সন্ত্রাসীদের কাছেই শাওন জানতে পারেন তার বাবা এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। শাওন বলছিলেন, ‘আমার বাবা সন্ত্রাসী দিয়ে আমাকে মার খাইয়েছেন। এর আগেও আরো তিন চারবার এমন জঘন্য ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন। কিন্তু সামাজিকতার কারণে কিছু বলিনি। সবচেয়ে বড় কথা, মন্দ হোক ভাল হোক তিনি আমার জন্মদাতা বাবা। মনে করেছিলাম একটু দেরি হলেও তিনি বুঝতে পারবেন।’

সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠা শাওন মায়ের জন্য এবার এক টুকরো জমি কিনতে গিয়েছিলেন। আর সেটাই কাল হলো। তার বাবা বুঝতে পারলেন, ছেলের হাতে টাকা এসেছে। এরপর তো ঘটল বর্বর ঘটনা। শাওন কান্না চেপে বলতে থাকলেন, ‘ভাই আমার এই কথাগুলো বলতে খুবই কষ্ট লাগছে। যতই হোক তিনি তো আমার বাবা।’

জীবন থেমে থাকে না। সেই দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে ঢাকা চলে এসেছেন ৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা এই স্পিনার। ১৬ ডিসেম্বর হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়েছেন। সামনেই জাতীয় ক্রিকেট লিগ। সেখানে ব্যাটে-বলে ঝড় যে তুলতে হবে। দুঃখীনি মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে লড়ে যেতে হবে শাওনকে।

তবে পুরো ঘটনা এখনো ভুলতে পারছেন না। শাওন জানালেন, ‘ওদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সত্যি বলতে কী যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। যে কারণে মামলা করতে বেশ ঝামেলা হয়েছে। আমার পরিবারের মানুষদের রাত ১১টা পর্যন্ত থানায় বসিয়ে রাখে পুলিশ। শুরুতে মামলা নিতে চায় নি। আমি তখন হাসপাতালের বেডে। এসময় মিডিয়া আর বিসিবিতে জানালাম। এরপরই মামলা নেয়। এখন পর্যন্ত দুই জনকে পুলিশ গ্রেফতার করছে।’

ঘটনা পেছনে ফেলে ২০ ডিসেম্বর থেকে ফের শুরু হওয়া জাতীয় লিগে চোখ রাখছেন এখন শাওন গাজী। বলছিলেন, ‘আমি সব ভুলে ক্রিকেটে মনোযোগ দিতে চাই। দেশকে অনেক কিছুই দেয়ার আছে আমার। কিন্তু ওই সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তিও দাবী করছি। আর আমার সঙ্গে যা হয়েছে তা যেন কোন মানুষের সঙ্গেই না হয়।’

Recent Posts

Leave a Comment