চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে রক্তাক্ত এক শিশুকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে দৌড়াচ্ছেন এক লোক। এই একটি ছবি কাঁদাচ্ছে হাজারো লোককে। গতকাল সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই মর্মন্তুদ ছবিটি ভাইরাল হচ্ছে। ছবির স্ট্যাটাস পড়ে জানা গেল, কক্সবাজারের রামুতে একটি সড়ক দুর্ঘটনা ও একজন পুলিশের মানবতার পরিচয়।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের রামু উপজেলার পানিরছড়া এলাকায় গত ১১ ডিসেম্বর যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে অন্য যাত্রীদের মতো বাসের নিচে তিন ঘণ্টা চাপা পড়ে থাকে সেই ছোট্ট শিশুটি। অনেক চেষ্টার পর সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় রক্তাক্ত শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। সেই অচেনা শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা পুলিশ সদস্য শের আলী।
অপরিচিত এই শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে চিৎকার করে কাঁদছেন সেই শের আলী। তিনি চট্টগ্রাম ডিবি পুলিশে কর্মরত। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শের আলীর কান্না দেখে উপস্থিত হাজার হাজার জনতাও তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। কে এই শিশুটি : শিশুটির নাম উম্মে হাবিবা। ৫ বছর বয়সী। শের আলী জানান, শিশুটি বেঁচে আছে এবং অবস্থা শঙ্কাজনক। শিশুটির জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন শের আলী। তিনি জানান, শিশুটিকে কক্সবাজার হাসপাতাল থেকে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শের আলীর ভাষ্য : নগর গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত এই কনস্টেবল ছুটিতে ছিলেন কক্সবাজারের বাড়িতে। দুই সন্তানকে নিয়ে দুপুরে খাওয়ার খাওয়ার সময় দুর্ঘটনার খবর শোনেন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে বাড়ি খুব কাছে হওয়ায় কয়েকজন প্রতিবেশীকে নিয়ে উদ্ধার কাজে নেমে পড়েন। একে একে ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান শের আলী। প্রায় তিন ঘণ্টা পর বাসের ভেতরে ব্যাগ রাখার জায়গায় এক শিশুকে আটকে থাকতে দেখেন তিনি। ব্যাগ রাখার স্থানে শিশুটির মাথা থেকে চোখ পর্যন্ত আটকে ছিল। সেটি ফাঁক করে মেয়েটিকে উদ্ধার করার পর সে তাকে ‘আব্বা’ বলে পানি খেতে চায়। শের আলীর নিজের মেয়েটিও একই বয়সী। তখন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই পুলিশ সদস্য। বলেন, মেয়েটি আব্বা বলার পর চোখে নিজের কন্যাশিশুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছিল। তখন আমি আর কান্না ধরে রাখতে পারিনি।
স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা হয়েছে, যমুনা টেলিভিশনের সাংবাদিক ইমরুল কায়েসের তোলা কয়েকটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। সকালে প্রথম আলোর প্রতিনিধি এস এম হানিফের পোস্টটি চোখে পড়ে। তিনি লিখেছেন, ‘হাজারো স্যালুট পুলিশ শের আলীকে। তোমার মতো এক একটি শের আলী জন্ম নিক ঘরে ঘরে। শের আলী ভাইয়েরাই আমাদের মানবতা শিখিয়ে দেন। তার মতো লোকরা আমাদের মানবতার শিক্ষক।’
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় সেখানে মানবতা বিপন্ন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে সেদেশের সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা বর্ণনামতে, সেদেশের সেনাবাহিনী মায়ের কোলকে কেড়ে নিয়ে কোলের শিশুকে অগ্নিকু-ে নিক্ষেপ করে, কুপিয়ে-পুড়িয়ে মারছে। সেই নিষ্ঠুরতায় কাঁদছে বিশ্ববিবেক। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশের নির্যাতন-নিপীড়ন ও পাশবিকতা সইতে না পেরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এদেশে পালিয়ে আসছেন শত শত রোহিঙ্গা। যাদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা বেশি। রোহিঙ্গাদের কান্নায় কাঁদছে বিবেক। যেখানে মিয়ানমার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা, সেখানে আমাদের পুলিশ বাহিনীর একজন শের আলীর মানবতায় বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে দেয়।
‘মানবতার সেনানী’ শের আলী
Recent Posts