মাসুদ হাসানের ‘হৃদয়ে হলুদ ডাকটিকেট’ : হৃদয়ের কথকতায় উদ্ভাসিত কাব্যগ্রন্থ

 In শিল্প-সাহিত্য

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

.
কবি-শব্দটি উচ্চারণ করা মাত্রই মনের ভেতর এসে ভর করে অদ্ভুত শিহরণ। আমরা উপলব্ধি করি পরম মমতায় আঁকা কোমল কোনো মুখকে, যাঁর কলমের শব্দশস্যে গড়ে উঠে কবিতার বিস্তীর্ণ ক্ষেত। যাঁর চিন্তায় শব্দের স্রোত নিত্য বহমান, যাঁর চেতনায় পৃথিবীর বিচিত্র লীলা-রূপ-রস-বৈচিত্র্য খেলা করে। আর এ জন্যেই কবির প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অপরিমেয়। সবাই কবি হতে চান এবং কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যের কেউ কেউ প্রতিনিয়ত চর্চা ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে কবি হয়ে উঠতে পারেন। বাংলাদেশের তরুণ কবিদের কথা বললে প্রথমে যে-কটি নাম প্রথমেই আসে-তারমধ্যে মাসুদ হাসান অন্যতম। ‘পড়ো যা, লিখো তার চেয়েও অনেক কম’-এমন কথার প্রতি আস্থাশীল বলেই মাসুদ হাসান দীর্ঘদিন লেখালেখি করলেও তার রচনাসংখ্যা খুব বেশি হয়ে দাঁড়ায় নি। তাই দেড়যুগের বেশি সাহিত্যচর্চা করেও এ পর্যন্ত তিনি একটির বেশি কাব্যগ্রন্থ লিখতে পারেন নি। ‘অনন্যা’ প্রকাশনী থেকে তাঁর প্রথম ও একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘হৃদয়ে হলুদ ডাকটিকেট’ প্রকাশিত হয়েছিলো ২০১৩ সালের বইমেলায়। বইটি প্রথম পাঠে মনে হলো, নিবিষ্ট কবির মতোই মাসুদ হাসান সচেতনভাবে চেয়েছেন, তার কবিতা যেন অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে উঠে। তিনি যে এমন প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির মেলবন্ধন স্থাপন করতে পেরেছেন-এ বইটি পাঠ করলে তার সাক্ষ্য ও সত্যতা পাওয়া যায়।

.
‘এত তাড়া কিসের, ফিরবই তো! স্নান শেষে অনিশ্চিত দুয়ারে আঘাত করব, পরিচয়হীন একটি বালক যে নিষ্কৃতি চেয়েছে, নিষ্কৃতি পেয়েছে। কড়া নেড়েছে ¤্রয়িমাণ প্রেমলগ্ন দরজায়। রহস্য নিয়ে কাগজের নৌকার প্রতিকৃতি এঁকেছি জলে, তার এত তাড়া কিসের? ফিরবই তো।’ এই কবিতাংশের মতো মাসুদ হাসানের সবগুলো কবিতাই শিল্পসম্মত সরলতায় উদ্ভাসিত। কবির বলার ভঙ্গি সহজ ও সাবলীল। শিল্পমান অক্ষুণœ রেখেই তার কবিতা সহজ-সাবলীল উপস্থাপনের মেঠোপথ ও শহুরে পাকা রাস্তা ধরে অবিরাম হেঁটেছে। তার কবিতাগুলো ধারণ করে আছে প্রেম, নিসর্গবোধ এবং এর সমুদয় যন্ত্রণা ও নিঃসঙ্গ যাপন। গ্রন্থটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে মুহম্মদ মুহসিন লিখেছেন, ‘মাসুদ হাসান ভাবিত সেইসব শব্দ-বাক্য-পাত্র ইত্যাদি নিয়ে যা যৌবনে অভিষিক্ত সকল মানুষের মনে অহোরাত্রি তোলপাড় তোলে। তিনি ভাবিত সেই সব সুখময় কল্পনা নিয়ে যা জীবনের সকলের অর্থকে এক মোহময়ী সুন্দরের জাদুবাক্সে আটকে রাখে। ফলে কবিতা বললেই যে সুন্দরের রোমান্টিক ছবি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, মাসুদ হাসানের কবিতায় সেই সুন্দর প্রতিভাত হয় খানিকটা রহস্যময়তায়র সঙ্গে।’ তাই বলে কবিতা থেকে সমাজচেতনা যে বাদ পড়েছে এমনটিও হয় নি। প্রেমের আশা-আকাক্সক্ষা কবিতায় প্রতিধ্বনিত হবার পাশাপাশি মানুষের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের ছাপও কবিতায় পড়েছে। তাই ‘হৃদয়ে হলুদ ডাকটিকেট’-এর কবিতাগুলো নেহাৎ প্রেমের কবিতা না হয়ে ভিন্নরকম বিচিত্রতা ও বহুমাত্রিকতা লাভ করেছে। এ কাব্যের অর্ধশতাধিক কবিতার প্রতিটিই গদ্যে লেখা। গদ্যকবিতা হলেও বাক্যের অন্তর্গত ছন্দের প্রবাহমানতা এসব কবিতায় সুস্পষ্ট। শব্দের বুনন কবিতার মুলভাবকে স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি প্রতিটি বাক্যকেও আলাদা আলাদাভাবে সৌকর্যম-িত করারও সামর্থ রাখে। ফলে এই কাব্যের কবিতাগুলো ভিন্ন ভিন্ন ব্যাঞ্জনা নিয়ে পাঠকদের সামনে হাজির হয়। তাই পাঠক কবিতা পাঠে কবিতার মূলবিষয়বস্তুর স্বাদ আস্বাদনের পাশাপাশি বাক্যসৌন্দর্যও পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেন।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আলোচ্য কাব্যের কবিতাগুলো রোমান্টিক ও রহস্যময়তাকে উচ্চকিত করে। কবিতাকে রূপ-রস-গন্ধ এনে দিতে মাসুদ হাসান প্রচুর উপমা ও উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার করেছেন। আবার কখনো কখনো এসব ছাপিয়ে কবিতায় ফুটে উঠেছে ভিন্নরকম এক সৌন্দর্যের জগৎ। কবি যখন বলেন, ‘কোন সে নারী, যাকে ঘিরে চলে দৃষ্টির উৎসব। সে রাগলে নাক ফুলে যায়, গালে টোল, চোখ দুটো হরিণীর মতো নির্লজ্জ উজ্জ্বল’ তখন এই ভালোলাগাটুকুও আমাদের মনকে ছোঁয়। আবার যখন উচ্চারণ করেন ‘নির্জনতার এ প্রহরে, ছিলাম আমি অন্ধ বিকেল আলো করে। বুকের বাঁশি বুকেই কাঁদে, সেই তো ভালো-কেন এলে? মিছে মিছে স্বপ্ন বুনে অনুভূতির এই দুপুরে।’ তখন কবিতার অন্তর্নিহিত বেদনাটুকু আমাদের উপলব্ধি করতে কষ্ট হয় না। কবিতার শব্দগুলো যখন ব্যক্তিগত বোধের মধ্য দিয়ে সার্বিক একটি বোধকে ধারণ করে, কবির কষ্ট যখন সকলের প্রাণে বাজে-তখন সেই কবিতাগুলো যে সার্থক হয়ে উঠে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সবকিছু পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় মানুষ। প্রত্যাশা করে সুন্দর কোনো দিনের। প্রার্থনা থাকে ‘ফের এলে যেন দেখি গাঁথা মালায় খেয়ে ফেললে সব শূন্যতা।’
‘হৃদয়ে হলুদ ডাকটিকেট’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনায় ‘এ চিঠি ব্যক্তিগত’ সিরিজের শেষ কবিতাটির কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। প্রেমে-ভাবনায়, মিলনে-চিন্তায়, উপমা ও উপস্থাপনে এ কবিতাটির নির্মিতি অদ্ভুত ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে। কবিতার শেষদিকে কবির চূড়ান্ত অভিব্যক্তি : ‘চিঠি তো আসেই, চিঠি আসবে-সে কার চিঠি, কার চিঠি টুঁটি চেপে ধরে। চিঠি আসে আনন্দে, চিঠি যায় বেদনায়…সবগুলো চিঠিই প্রাপকহীন হোক, ডাকপিয়ন চিনে যাবে ঠিকই, কারণ সব প্রেমিকার হৃদয়ে লাগানো থাকে হলুদ ডাকটিকেট।’ রোমান্টিসিজম যে ঘোরলাগা অদ্ভুত জগতের কথা বলে, এ কবিতাটি পাঠে পাঠক সেই জগৎকে সহজেই খুঁজে পাবেন।
হৃদয়ে হলুদ ডাকটিকেটের চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১০০ টাকা ।

Recent Posts

Leave a Comment