শুভ জন্মদিন জাকিয়া বারী মম

 In বিনোদন
বাংলাদেশে বর্তমানে যে কজন অভিনেত্রী অভিনয়ে নিজের দক্ষতা ও নৈপুণ্য দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, হয়েছেন দর্শকনন্দিত-তাঁদের মধ্যে জাকিয়া বারী মম অন্যতম ও অগ্রগণ্য। তাঁর বিশেষত্ব তাঁর অভিনয়ের দক্ষতা ও পরিমিতিবোধে। পরিমিতিবোধের কথা বললাম কারণ, একজন শিল্পী কোন কাজটা করবেন এবং কোন কাজটা করবেন না-এই সিদ্ধান্ত নেয়া তাঁর জন্যেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গড়পড়তা কাজ করলে সেগুলো অপচয় হবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। অন্যদিকে যারা বেছে বেছে কাজ করেন, তাদের কাজগুলো ভালো হয়। কথায় আছে, মন্দ দশটা কাজের চেয়ে ভালো একটা কাজ করা অনেক ভালো। জাকিয়া বারী মম’র পরিমিতিবোধ বেছে বেছে ভালো কাজগুলোর করার ক্ষেত্রে। ভালো কাজের জন্যে তাঁকে দীর্ঘদিন প্রতীক্ষা করতে হয়, সংবরণ করতে হয় সস্তা উপস্থাপন ও অর্থের মোহ। তাঁর এই প্রতীক্ষায় নিঃসন্দেহে দর্শককুল উপকৃত হন। কারণ, মম’র অভিনীত নাটক বা চলচ্চিত্র দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে (এখানে মম’র পাশাপাশি নাট্যকারসহ কলাকুশলীদের অবদান অবশ্যই স্বীকার্য)। মম’র অভিনয় কেবল দর্শকদের আবিষ্ট করে না, তাঁর শিল্পীসত্ত্বা মুগ্ধ করে শিল্পবোদ্ধাদের। বাংলাদেশের মিডিয়ায় মানসম্মত দর্শক রুচি নির্মাণে তাঁর অভিনয় প্রশংসাযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
নাটক বা চলচ্চিত্রকে সফল উপস্থাপনের জন্যে টিমওয়ার্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভালো নাটক নির্মাণের জন্যে প্রথমত ভালো একটি গল্প প্রয়োজন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মমকে এই বিষয়টি বেশ জোর দিয়ে বলতে দেখি। টিভি নাটকের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার প্রথম স্তরটিই হচ্ছে ভালো গল্প। একথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন, যদি টিভি নাটকের অধিকাংশ গল্পগুলো শিল্পসম্মত হতো তাহলে দর্শকদের কাছে নাটক আরো বিস্তৃত পরিসরে সমাদৃত হতো। ভালো গল্পের প্রয়োজন জোরালো থাকলেও অনেকে এই বিষয়টি নিয়ে তেমন কথা বলেন না। সেখানে জাকিয়া বারী মম’র উচ্চকণ্ঠ একদিকে শিল্পীর দায় মেটায় ও অন্যদিকে সময়ের যথার্থ দাবিকে উচ্চকিত করে। শিল্পীর দায় প্রসঙ্গে আরেকটি কথা চলে আসে। একজন শিল্পীও মানুষ এবং তিনি সাধারণ মানুষের মতো নন, তিনি সৃজনশীল ও ব্যতিক্রম। সেজন্যে রাষ্ট্র বা সমাজের প্রতি একজন শিল্পীর দায়-দায়িত্ব সাধারণের মানুষের চেয়ে বেশি বলেই আমার মনে হয়। মমকে তাঁর সামাজিক দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে আন্তরিক ও সচেষ্ট থাকতে দেখি। তাঁকে কখনো দেখি শীতবস্ত্র নিয়ে শিশুদের পাশে দাঁড়াতে, কখনো দেখি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কোনো শিল্পীর বিপদে-আপদে। পাশাপাশি তিনি অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক ও জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে। এমন কাজ একজন শিল্পীকে আরো বেশি মানবিক ও জনসম্পৃক্ত করবে এটাই স্বাভাবিক।
দুই.
জাকিয়া বারী মম’র জন্ম ১৯৮৫ সালে, ঢাকায়। তাঁর বাবা মজিবুল বারী ও মা আয়েশা আক্তার। তাঁর শৈশব কেটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সেখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতঙ্গনে তিনি নাচ শিখেন। শৈশব থেকেই সংস্কৃতির প্রতি সম্পৃক্ত থাকার কারণে ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো মমকে দেখা যায় টিভির পর্দায়। এসময় তিনি বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও লাভ করেন। মম পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন স্যারের স্মৃতিধন্য নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। অনার্স ও মাস্টার্সে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। ২০০৬ সাল মম’র অভিনয় জীবনের জন্যে বিশেষ সময়। এ বছর তিনি ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন এবং ‘দারুচিনি দ্বীপ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া দারুচিনি দ্বীপ ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। জাকিয়া বারী মম অর্জন করেন সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। আগেই উল্লেখ করেছি, মম’র পরিমিতিবোধ প্রশংসাযোগ্য। এ কারণেই ২০০৭ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তাঁর অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা তিনটি ছাড়ায় নি। ২০১৪ সালে ‘প্রেম করবো তোমার সাথে’ ও ২০১৫ সালে ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ মম’র বাকি দুই ছবি। ছুঁয়ে দিলে মন চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পরপর দর্শক ও সমালোচক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এতে অভিনয়ের জন্যে শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী (নারী) বিভাগে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার লাভ করেন মম। মম বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ‘আমি যখন যে কাজটা করি, সেটা মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করি। যে কারণে প্রস্তাব পেলেই একসঙ্গে দু’ তিনটি ছবির কাজ করা হয় না। কারণ একটি ছবির পেছনে অনেকের অনেক স্বপ্ন থাকে।’ প্রথম আলোর এক সাক্ষাৎকারে ‘ঢাকার বাইরের ছবির প্রস্তাব পেলে কী করবেন’ প্রশ্ন করা হলে মম বলেছিলেন, ‘বিদেশের ছবি পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বো না। প্রথমত গল্পটি ভালো হতে হবে, দ্বিতীয়ত হতে হবে ভালো পরিচালক।’ মম পরবর্তীতে তাঁর কথা রেখেছেন। যা করেছেন মনোযোগ দিয়ে করেছেন। ক্ষণস্থায়ী হবে, এমন কোনো জোয়ারে গা ভাসান নি। এখানেই মম’র বিশেষত্ব। কারণ, আমাদের মধ্যে রীতিমতো ছবি করার প্রতিযোগিতায় হয়। দিনে দিনে কেবল ছবির সংখ্যা বাড়ে। গুণগত মান বাড়ে না। মম’র ছবির সংখ্যা কম হলেও তাঁর নির্বাচন ঠিক রয়েছে। তাই তাঁর অভিনীত তিনটি চলচ্চিত্রের মধ্যে দুটি চলচ্চিত্রই দর্শক ও সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। নাটকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর আলাদা চিন্তাধারা রুচিশীলতার পরিচায়ক এবং সুস্থধারার বিনোদনের জন্যে সহায়ক। মম তাঁর চিন্তার কারণেই আগামীতে আরো ভালো কিছু করতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
তিন.
দীর্ঘদিন চর্চা ও পড়াশোনার মধ্য দিয়ে যেসব শিল্পী টিভি পর্দায় আসেন তারা ভালো করতে পারেন। কারণ তখন অভিনয় তাঁদের রক্তে-অস্তিত্বে মিশে থাকে। নাটক নিয়ে পড়া ও শৈশব থেকে সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকা জাকিয়া বারী মম’র সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় সামান্য। তাঁর সাথে যতোদিন কথা হয়েছে, ততোদিনই আমার মনে হয়েছে-তাঁর আন্তরিকতা অসামান্য। অভিনয় নিয়ে তাঁর যথেষ্ট চিন্তাভাবনা আছে। তাঁর অনেক নাটক আমি দেখেছি। আমার ধারণা, স্বল্পসময়ে নাটকের মমকে জানার জন্যে, তাঁর অভিনয় দক্ষতা দেখার জন্যে ‘অক্ষয় কোম্পানীর জুতো’ দর্শকরা দেখতে পারেন। এ নাটকে মম তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। লাবণ্য, ঠাকুরজি ও বনলতা সেন-এ তিন চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সাহিত্যের চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন। বিশেষত কালোবরণ ঠাকুরজির চরিত্রে তাঁকে বেশ মানিয়েছে। সব মিলিয়ে মমকে শতাব্দিপ্রাচীন নারীর মতোই লেগেছে। তাঁর নাটক দেখে আমি আমার ভালো লাগার কথা অথবা ভালো না লাগার কথা তাঁকে বহুবার জানিয়েছি। তিনি সমালোচনাকে সহজে মেনে নিতেন। এই মানসিকতা আমাদের খুব দরকার।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৯ ডিসেম্বর আমাদের প্রিয় এই অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম’র জন্মদিন। তাঁকে জন্মদিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই এবং প্রত্যাশা করি, অভিনয় দক্ষতা ও পরিমিতবোধ নিয়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র ও নাটককে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন, দর্শকদের ঋদ্ধ করবেন।
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : সম্পাদক, বাঁক।
Recent Posts

Leave a Comment