সরকারের ইচ্ছা পূরণের জন্য ধন্যবাদ!

 In খোলা কলাম

কামাল আহমেদ

.আসুন, আমরা সবাই নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানাই যে একটি ‘সুষ্ঠু নির্বাচনে’ ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিজয়ের জন্য বাংলাদেশে অতীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজন শেষ কবে পড়েছিল, তা তো আমরা ভুলেই গেছি। তা-ও আবার ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী। মান্যবর কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ এবং তাঁর চার সহকমিশনার যখন বাংলাদেশে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফেনী মডেল’কে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন, তখন নারায়ণগঞ্জে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে, সেটাই তো একটা বড় অগ্রগতি। নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশনে বাড়তি পাওনা হলো ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ—গত কয়েক বছরে যেটি ক্রমশই সংকুচিত হয়ে এসেছে।
রকিব কমিশনের জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে শেষ পরীক্ষা বলে অনেকেই অভিহিত করেছিলেন। শেষ ভালো যার সব ভালো তার—এই বাগ্ধারা প্রয়োগ করে অনেকে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন যে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থা ফেরাতে সক্ষম হবে। তাঁরা সম্ভবত ভুলে গেছেন যে দেশে এখন আরেকটি নির্বাচন চলছে এবং সেই জেলা পরিষদ নির্বাচনেও যথারীতি ২১টি জেলায় ফেনী মডেল দাপটের সঙ্গে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। আর যেসব জেলা পরিষদে এখনো নির্বাচনী প্রক্রিয়া বহাল আছে, সেসব জায়গায় আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই রকিব সাহেবের কমিশন সরকারি তালিকার প্রার্থীর পক্ষেই ভূমিকা রাখছে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের কোনো অভিযোগ আমলে নিয়েছে, এমন কথা কেউ শোনেনি।
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয়কে কোনোভাবেই খাটো করা যায় না। কেননা, গতবারই তিনি প্রমাণ করেছেন, সরকারের ইচ্ছাকে চ্যালেঞ্জ করেও তিনি জিততে সক্ষম। অদম্য এই নারীনেত্রী এবারও তাঁর সাহস, দৃঢ়তা ও ভালো কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন। আগেরবার তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই জিতেছিলেন। কিন্তু তখন ছিল শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর দাপটের মুখে তিনি সেবার সেখানে সেনা মোতায়েনের দাবিও জানিয়েছিলেন এবং কমিশন সেই প্রস্তাবও করেছিল। তবে সরকার তখন কমিশনের অনুরোধ শোনেনি। সেনা মোতায়েন ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আইভী লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। আরও একটি পার্থক্যও ছিল, সেটি হলো, সেবার কোনো দলীয় প্রতীক ছিল না।
নির্বাচনের দুদিন আগেও আইভীর কথায় কমিশনের প্রতি একধরনের আস্থাহীনতার প্রতিফলন পাওয়া গিয়েছিল। তিনি একটি তৃতীয় শক্তির অঘটনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, কমিশনও ওই তৃতীয় শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তৃতীয় শক্তিটি ক্ষমতাসীন দলেরই একটি অংশ। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অপসারণের দাবি পূরণ না হওয়ায় তাঁর অস্বস্তি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আশঙ্কার অন্যতম একটি বড় কারণ ছিল, ক্ষমতাসীন দলের ওই অংশটি তাদের সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থীদের জেতাতে কেন্দ্র দখল বা অন্য কোনো অনিয়ম করলে সেসব জায়গায় মেয়র পদের ভোট তাঁর পক্ষে না-ও পড়তে পারে। নির্বাচনী প্রচার যেদিন শেষ হয়, সেদিন ঢাকা ট্রিবিউন একটি প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্ল্যাহকে উদ্ধৃত করে জানায় যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে নারায়ণগঞ্জে দলের সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা লড়ছেন মেয়র পদের জন্য, কাউন্সিলর পদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য নয়। বোঝাই যায়, শীর্ষ নেতৃত্বের ওই বার্তা পাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের কথিত বড় ভাই হাল ছেড়ে দেন। ফলে, রকিব কমিশনকে আর বাড়তি কোনো কোশেশ করতে হয়নি। আপনাআপনিই ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ সম্পন্ন হয়।
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে জয়ী হয়েছে প্রায় সব পক্ষই। ইংরেজিতে যে উইন-উইন শব্দযুগল ব্যবহৃত হয়, এখানে তার আক্ষরিক প্রয়োগ ঘটালে সম্ভবত ভুল হবে না। আইভী নারায়ণগঞ্জবাসীর ম্যান্ডেট পেয়েছেন, সেটা তাঁর জন্য একটা প্রাপ্তি। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রাপ্তি হলো আওয়ামী লীগে তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি পাওয়া। আওয়ামী লীগ সব সময়ই বিজয়ীদের দলে টেনে নেয়, সে কারণে গতবার বিদ্রোহী হয়ে তাঁর যে তেমন একটা ক্ষতি হয়নি, তার প্রমাণ, এবার দল তাঁকেই প্রার্থী করেছে। সেটা জেলা কমিটির মনোনয়নের তালিকা নাকচ করেই। আর পুনর্নির্বাচনের পর জেলার অন্য সাংসদদের বাদ দিয়ে তাঁকে আলাদাভাবে গণভবনে আতিথেয়তা দেওয়ার প্রতীকী মূল্য অনেক বেশি। ক্ষমতাসীন দলের যে অংশটি নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত, তাদের রাশ টেনে ধরার এ এক অনন্য সুযোগ। বিএনপিরও কিছু প্রাপ্তি যোগ হয়েছে। প্রথমত, দলের নেতা বলে পরিচিত মুখ তৈমুর আলম খন্দকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দলটি একজন নতুন মুখ খুঁজে পেয়েছে। যাঁকে তারা পেয়েছে, সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতায় কোনো ঘাটতি নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনগুলোতে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত বেদনা ও হতাশার। তখন তাদের কর্মীরা হয়রানি-গ্রেপ্তারি এড়াতে পারেননি, কিন্তু নারায়ণগঞ্জে পেরেছেন। ভোটের আগের রাতে তালিকা ধরে পোলিং এজেন্টদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেনি। নারায়ণগঞ্জবাসীও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারেন এই ভেবে যে এবার হয়তো ‘সন্ত্রাসের নগর’ তকমাটি মুছে যাবে।
রকিব সাহেবদের লাভ যে এই নির্বাচনটিতে কেউ অন্তত তাঁদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ আনছে না; বরং সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেও তাঁরা বাহবা পাচ্ছেন। সরকার না চাইলে তাঁরা যে এটি করতেন না, সেটা আমরা ভুলে যাচ্ছি। কমিশন যে সরকারের ইচ্ছাই পূরণ করেছে, তার প্রমাণ শুধু ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিজয়েই পাওয়া যায়, তা নয়। ভোটের দিন ভোট শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্যটি স্মরণ করুন। তিনি বলেছেন, ‘যেকোনো মূল্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে ওয়াদা করেছিলাম, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।’ তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।’ (ভোরের কাগজ অনলাইন, ২২ ডিসেম্বর ২০১৬)।
সরকার কেন এই নির্বাচনকে ভালো প্রমাণের চেষ্টা করছে? উত্তরটি সহজ। শুক্রবার ওবায়দুল কাদের বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন প্রমাণ করেছে, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সক্ষম। ওই একই দিনে বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ আর কোনো দাবিদাওয়া পেশ না করে বর্তমান সরকারের অধীনে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোও অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।’
তিন বছর ধরে সরকার ও নির্বাচন কমিশন দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সততা (ইন্টিগ্রিটি) এবং বিশ্বাসযোগ্যতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পর যখন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের সময় সমাগত, তখন সমস্বরে রকিব কমিশনকে বাহবা দেওয়া বিভ্রান্তিকর। আর এ ধরনের ভ্রান্তিবিলাস গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। বর্তমান সরকারের আট বছর এবং তার আগের আড়াই বছর, মোট ১০ বছরের বেশি সময় ধরে শুধু আজিজ-মার্কা কমিশনের কথাই আমরা শুনে এসেছি। কিন্তু আজিজ কমিশন গণ-আন্দোলনের মুখে সরে যেতে বাধ্য হওয়ায় নির্বাচনব্যবস্থার ততটা সর্বনাশ ঘটানোর সুযোগ পায়নি, যতটা ঘটিয়েছে রকিব কমিশন। নতুন কমিশন গঠনের আলোচনায় তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে আজিজ ও রকিব—দুই কমিশনের কথাই স্মরণে রাখতে হবে। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী কমিশন গঠনে ব্যর্থতার জন্য ভোটাররা বারবার ভোটের অধিকার হারাবেন, সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
রকিব কমিশনকে যাঁরা বাহবা দিতে চান, তাঁদের কাছে কমিশনের ব্যর্থতার দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরা খুবই সহজ। কিন্তু আমি সে পথে যাব না। তবে দু–একটি সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন বাংলাদেশে এর আগে আর কোন নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দিতে না পেরে আদালতে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে, তা কি কেউ বলতে পারবেন? যে নির্বাচনকে ‘মডেল’ বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে দলীয় আনুগত্যের প্রমাণ দিতে নৌকায় সিল দেওয়া ব্যালট ডজন ডজন ক্যামেরার সামনে তুলে ধরে আইন ভাঙলেন যে সাংসদ, তাঁর বিরুদ্ধে কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছে? সরকারকে বিব্রত করার মতো পদক্ষেপ কমিশন কেন নেবে না, সেটা বুঝতে কারও বাকি থাকার কথা নয়। যে নির্বাচনী কর্মকর্তা তাঁর বুথে সাংসদকে লাইভ শো করতে দিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেই বা কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো? এই মডেল অনুসরণ করা হলে ভবিষ্যতেও তো সাংসদেরা কাকে ভোট দিলেন, সেটা সরাসরি সম্প্রচার করবেন!
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Recent Posts

Leave a Comment