সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত মিরাজ

 In জাতীয়

‘রিপন স্যারের ওপর হামলাকারীদের ধরতে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য। কোনো কিছুর আশায় যাইনি। ওই সময় আমাকেও মেরে ফেলতে পারত তারা। তারপরও আমি গিয়েছি।’ এভাবেই সেদিনের কথা বলছিলেন মাদারীপুরের তরুণ মো. মিরাজ সরদার। আহত রিপন স্যারকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন স্থানীয় সদর হাসপাতালে, সেখান থেকে বরিশাল মেডিকেল কলেজে।

মিরাজ সরদার এবার ‘ফারাজ হোসেন সাহসিকতা পুরস্কার ২০১৬’-এর বিজয়ী। সহকর্মীর প্রতি সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত হিসেবে কোনো ব্যক্তির অনন্য সাহসিকতার স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে পেপসিকো গ্লোবাল এ পুরস্কার দিচ্ছে। মিরাজ সরদার মাদারীপুরের সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজে অফিস সহকারীর কাজ করেন।

এ বছরের ১৫ জুন মাদারীপুরের কলেজশিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর ওপর ওই হামলার ঘটনা ঘটে। বিকেলে কলেজ-সংলগ্ন মাস্টার কলোনিতে ওই শিক্ষকের ভাড়া বাসায় কলবেল চাপেন তিন যুবক। তিনি দরজা খুললে তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন তাঁরা। তাঁকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে পালানোর চেষ্টা করেন।

ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে মিরাজ সরদার বলেন, রোজার মাসের বিকেলবেলা। তিনি প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে বাবার বাসা থেকে নিজের বাসায় ফিরছিলেন। কলেজের কাছাকাছি ওই সড়কে আসার সময় তিনি দেখতে পান তিন যুবক দৌড়ে পালাচ্ছেন। ওই সময় সামনে গিয়ে তিনি মোটরসাইকেল থামান। তখন রিপন স্যার যে বাসায় ভাড়া থাকতেন, সেই বাড়ির মালিক সোবহান মুনশি জানান, দু-তিনজন ছেলে স্যারকে মেরে ফেলে পালিয়েছে।

মিরাজ বলেন, ‘আমি মোটরসাইকেল থেকে আমার ছেলেকে নামিয়ে দিই। তারপর মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তার দিকে ছুটে যাই। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, তারা দুই ভাগ হয়ে অটোতে চড়ে দু দিকে চলে গেছে। একজন বলল, অটো দেখলে সে চিনতে পারবে। আমি তাকে মোটরসাইকেলের পেছনে নিয়ে ধাওয়া করি অটোর পেছনে।’

মিরাজ আরও বলেন, ‘কিছু দূর গিয়ে দেখি ডিসির বাসার সামনে অটো থেকে নেমে তারা ভাড়া দিচ্ছে। আমরা তাদের ধরতে গেলে দুজন দুই দিকে দৌড় দেয়। আমরাও তাদের পেছনে তাড়া করি। একপর্যায়ে আমি একজনকে পেছন থেকে জাপটে ধরি। অনেক চেষ্টা করেও সে ছুটতে পারেনি। এই পর্যায়ে লোকজন এলে তাকে নিয়ে আমরা কলেজের সামনে চলে যাই।’

কলেজের সামনে গিয়ে আটক গোলাম ফায়জুল্লাহ ফাহিমকে স্থানীয় মানুষের হাতে তুলে দেন মিরাজ। তিনি বলেন, ‘ফেরার সময় দেখি আমার শাশুড়ি ও স্যারের গৃহকর্মী স্যারকে নিয়ে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। আমিও তাঁদের সঙ্গে চলে যাই। মাদারীপুর সদর হাসপাতাল থেকে পরে তাঁকে নিয়ে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যাই।’

মিরাজ বলেন, মানুষের জন্য কিছু করা তাঁর ছোটবেলা থেকেই অভ্যাস। যদিও বড় আকারে তেমন কিছু করেননি। কিন্তু রিপন চক্রবর্তীর ওপর হামলাকারীদের ধরতে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া প্রসঙ্গে মিরাজের কথা হলো, ‘জীবন-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতেই। এটা নিয়ে আমি কখনোই ভাবি না।’

হামলায় আহত কলেজশিক্ষক রিপন চক্রবর্তী এখন সুস্থ আছেন। বরিশালের একটি কলেজে শিক্ষকতা করছেন তিনি।

সাধারণ একটি পরিবারের সন্তান মিরাজ হোসেন সংগ্রামের ভেতরেই বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা দুলাল সরদার অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য। মিরাজ বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে ঠিকমতো লেখাপড়াও করতে পারেননি। একাধিকবার বিরতি পড়েছে পড়াশোনায়। এসএসসির গণ্ডি পেরোতে পারেননি শুরুতে। অষ্টম শ্রেণির সনদ নিয়ে কলেজে অফিস সহায়কের কাজ নেন মাত্র ৪০০ টাকা বেতনে। চাকরি করতে করতেই ২০০২ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন, যদিও স্বাভাবিকভাবে তাঁর এসএসসি পাস করার কথা ৯৬ সালে। ২০০৪ সালে পাস করেন এইচএসসি। বর্তমানে একই কলেজের হিসাব বিভাগে অফিস সহায়কের কাজ করছেন, বেতন পান পাঁচ হাজার টাকা। থাকেন কলেজের ভেতরে পুরোনো একটি টিনের ঘরে।

মিরাজ বলেন, যদিও পুরস্কারের জন্য কিছুই করেননি, তারপরও পুরস্কারের এ টাকা তাঁর পরিবারের অনেক কাজে লাগবে। স্ত্রী ও শাশুড়ির চিকিৎসা করাবেন। বাবা-মায়ের জন্যও কিছু করার ইচ্ছা আছে তাঁর।

Recent Posts

Leave a Comment