স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উক্তি ও রাজনৈতিক তেল

 In খোলা কলাম

চিররঞ্জন সরকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উক্তি ও রাজনৈতিক তেল

গত বৃহস্পতিবার তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকা অর্ধদিবস হরতালের শেষ মুহূর্তে মারধরের শিকার হয়েছেন দুই গণমাধ্যম কর্মী। রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে আটক ব্যক্তির ফুটেজ নিতে গিয়ে তারা এ হামলার শিকার হন। তারা হলেন, এটিএন নিউজের রিপোর্টার কাজী এহসান বিন দিদার এবং ক্যামেরাপারসন আব্দুল আলিম। হামলায় ক্যামেরাপরসনের চোখের উপরের অংশ কেটে গেছে। ক্যামেরা ভেঙে গেছে। রিপোর্টারের পা ভেঙে গেছে। তারা অভিযোগ করে বলেন, হরতালের শেষ মুহূর্তে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। আটকদের ছবি তুলতে গেলে পুলিশ তেড়ে এসে মারধর করে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘পুলিশ সাংবাদিকদের নির্যাতন করে না। মাঝে মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি লেগে যায়। বৃহস্পতিবারও তাই হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই উক্তি শোনার পর মনের পর্দায় ভেসে উঠল আরও কয়েকজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখ! কানে বেজে উঠল প্রায় লোকগাথায় রূপ নেয়া তাদের সেই সময়ের কথাগুলো। ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে!’ কিংবা ‘উই আর লুকিংস ফর শত্রুস!’ অথবা ‘ঈদের সময় ঘরে তালা দিয়ে যাবেন!’ অথবা ‘হরতাল সমর্থকরা রানা প্লাজার পিলার ধরে নাড়াচাড়া দেয়ায় ধসে পড়েছে ভবনটি!’

বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের স্মৃতির পাতা থেকে টেনে তুললেন! মনে পড়ে গেল আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, সাহারা খাতুন আর ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে। আর মন থেকে অবচেতনে বেরিয়ে আসছে, হায়!  আমাদের সব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন এমন হয়? হয়। কারণ, তাদের জবাবদিহি করতে হয় না। তারা কিছু একটা বলে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করেন। তারা সাধারণ মানুষকে আহাম্মক ভাবেন। তা না হলে প্রত্যেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই কীভাবে এমন উক্তি করেন?

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেছিলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে তখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতারা কি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন? তাদের কেউ কেউ বলেছিলেন, একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী এমন কথা কিভাবে বলেন! কিন্তু এখন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরাই হাস্যকর সব মন্তব্য করছেন! এখন তাদের ‘দায়িত্বশীলতা’ কোনো ম্যাটারই করছে না!

আসলে মিডিয়ার মনোমোহিনী আকর্ষণ থেকে দূরে থাকা কঠিন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অন্যান্য মন্ত্রী কেন, মিডিয়ার লোকজন নিজেরাও প্রচারের লোভ সামলাতে পারেন না! কে কার থেকে বেশি সময় পর্দায় থাকতে পারেন, তার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ব্যতিক্রম নন। তারাও নানা উল্টাপাল্টা মন্তব্য করে মিডিয়ায় প্রচার পেতে চান। আলোচিত হতে চান।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের অপরিণামদর্শী মন্তব্যের জন্য কখনও দুঃখিত, লজ্জিত কিংবা অনুতপ্ত হন না। বরং দায় চাপান মিডিয়ার ঘাড়ে। বলেন, তার বক্তব্য বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এ ধরনের বক্তব্য শুনে দেশের মানুষ হতাশ হন। ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত হন। বিবেকবান মানুষমাত্রই এ ধরনের বক্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে মনে করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুধু কি দায়িত্বজ্ঞানহীন?  না, তার চেয়েও মোটা দাগের কিছু। রাজনীতিসচেতন মানুষ কেন, সাধারণ মানুষের কাছেও চিত্তবিনোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তব্য! ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে!’ ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুস!’ ‘ঈদের সময় ঘরে তালা দিয়ে যাবেন!’ ‘হরতাল সমর্থকরা ফাটল ধরা রানা প্লাজার পিলার ধরে নাড়াচাড়া করা ভবন ধসের অন্যতম কারণ হতে পারে!’ তারই ধারবাহিকতায় ‘পুলিশ সাংবাদিকদের নির্যাতন করে না। মাঝে মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি লেগে যায়।’ কি বলব একে? কৌতুক? রসিকতা? নাকি বিপন্নতা নিয়ে উন্নাসিকতা? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের কি এমনই হতে হয়? চরম ট্র্যাজেডিকে কমেডি বানিয়ে দিতে পারাই কি এই পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা? এসব কথা শুনলে কী নেত্রী খুশি হন? কেন তাদের এত কথা বলতে হবে?কেন এই পদটার মান একেবারে নাভির নিচ পর্যন্ত নামিয়ে আনতে হবে?

পরিশেষে একটা উপকথা।

এক গুরু আর তার শিষ্য। দু’জনে মিলে ঘুরতে ঘুরতে এক অচেনা দেশে এসে হাজির। হঠাৎ গুরুর চটি ছিঁড়ে গেল। কাছেই এক মুচির কাছে গিয়ে হাজির গুরু-শিষ্য। মুচি তখন ঘুমোনোর জোগাড় করছেন। মালপত্র তুলে ফেলেছেন। গুরু বললেন, ‘ভাই চটিটা একটু সেলাই করে দাও। তোমাকে আমি খুশি করে দেব’। মুচি সেই কথা শুনে মন দিয়ে ছেঁড়া চটি সেলাই করে দিলেন। গুরু তাকে একটা টাকা দিলেন। মুচি বললেন, ‘ওই যে বললে খুশি করে দেবেন। খুশি তো হলাম না’। গুরু দু’টাকা দিলেন। মুচি বললেন, ‘না ভাই। হচ্ছে না’। গুরু হেসে দশ টাকা দিলেন। মুচি বললেন, ‘খুশি খুশি ফিলিংই তো হচ্ছে না’! গুরু একশো টাকা দিলেন। মুচি মাথা নাড়েন। গুরু দুশো দিলেন। মুচি করুণভাবে বলেন, ‘বুঝতে পারছি, আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু স্যার আমার মোটেই খুশি খুশি লাগছে না’। গুরু তখন হতাশ হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে ওগুলো ফেরত দাও। আর আমাকে এক সপ্তাহ সময় দাও। আমি ঠিক তোমায় খুশি করে দেব’। মুচি হাত জোড় করে গুরুকে বিদায় দিলেন। এর দু’তিন দিন বাদে এক গভীর রাতে গুরু-শিষ্যের বাড়িতে এসে রাজার পেয়াদা কড়া নেড়ে দরজার বাইরে থেকে চিৎকার করে বলল, ওহে বিদেশি, রাজার ছেলে হয়েছে ‘তুমি খুশি’? শিষ্য কী যেন বলতে যাচ্ছিল। গুরু তার মুখ চেপে ধরে, চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ খুশি’। পেয়াদা চলে যেতেই গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে মুচির বাড়ি গেলেন গুরু। তার পর পেয়াদার মতো গলা করে বললেন, ‘ওহে মুচিভাই রাজার ছেলে হয়েছে তুমি খুশি’? মুচি বলল, ‘হ্যাঁ আমি খুশি’। গুরু ফের বললেন, ‘শোনও মুচি ভাই, রাজার ছেলে হয়েছে তুমি কি খুব খুশি’? মুচি ঘরের ভিতর থেকে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ আমি খুব খুশি’। গুরু আবার চিৎকার করে বললেন, ‘ঠিক করে বল, রাজার ছেলে হয়েছে তুমি কি ভীষণ খুশি’? মুচিভাইয়ের তাৎক্ষণিক উত্তর, ‘হ্যাঁ আমি ভীষণ খুশি’। এইবার গুরু মুচিকে বললেন, ‘ভাই একটু বাইরে এসো তো দেখি’! মুচি বাইরে আসতেই গুরু বললেন, ‘প্রথম খুশিটা রেখে খুব খুশি আর ভীষণ খুশিটা ফেরত দাও দেখি ভাই’।

এই খুশি করার ব্যাপারটা এখন আমাদের রাজনীতিতে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। ক্ষমতাকে খুশি করার ঝোঁক আদি অনন্ত কালের। মুচি শুধু তার একটু ভাগ পেতে চেয়েছিল। হল না। রাজা রানিরা চলে গেছে। কিন্তু আজকের গণতন্ত্রের যুগেও খুশি-পলিটিক্স একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। উপকথার যুগে চলে গিয়েছিলাম। ফের ফিরে আসি বাংলাদেশে। রাজধানীতে বিভিন্ন পোস্টার-ফেস্টুন দেখুন। অমুক নেতা কিংবা তমুক নেত্রীর বন্দনা।

এসবের একটা সাদা বাংলা নাম আছে। তেল দেওয়া। তেলের সমস্যা হল, যতক্ষণ সেটা বাঁশে দেওয়া হয়, পাটিগণিতে দেখেছি, অসুবিধা বাঁদরদের। কিন্তু যখন সেটা গিয়ে পড়ে নেতা-নেত্রীর পায়ে, অনেকে বলেন, তাতে নাকি তাঁদের চোখের ‘কোলেস্টোরেল’ বেড়ে যায়। তখন দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। মানে অনেক কিছু, যা দেখা জরুরি, তখন আর দেখা যায় না।

আর না দেখতে পেলে বিপদের আশঙ্কা বাড়ে। যেমন শিবরাম চক্রবর্তী লিখেছিলেন। এক দিন শিবরাম হর্ষবর্ধনের বাড়িতে গিয়ে দেখেন, মুখ ব্যাজার করে গোবর্ধন বাড়ির সিঁড়িতে বসে আছেন। শিবরাম বললেন, ‘দাদা কোথায়’? গোবর্ধন বললেন, ‘দাদা হাসপাতালে’। শিবরাম বললেন, ‘কেন কেন, দাদা হাসপাতালে কেন’? গোবর্ধন বললেন, ‘এই যে সিঁড়িটা দেখছেন না’! শিবরাম বললেন, ‘ হ্যাঁ, দেখছি তো, তাতে কী হয়েছে’? গোবর্ধন বললেন, ‘দাদা দেখতে পায়নি’।

তবে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের এখনও এত দুর্দিন পড়েনি যে তাদের শিবরামের থেকে শিখতে হবে! পাঠক কী বলেন?

সূত্র: পরিবর্তন ডটকম।

Recent Posts

Leave a Comment