অ্যা জার্নি বাই ভ্যান
প্রভাষ আমিন 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি নিয়ে তোলপাড় চলছে। যতটা না গণমাধ্যমে, তার চেয়ে বেশি সামাজিক মাধ্যমে। গত সপ্তাহে শেখ হাসিনা তার ছোট বোন শেখ রেহানার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে টুঙ্গীপাড়া যান। বঙ্গবন্ধু পরিবারের বেঁচে থাকা এ দুই সদস্য অবশ্য সুযোগ পেলেই টুঙ্গীপাড়া যান। তবে গত সপ্তাহে শেখ হাসিনা এক যুগ পর গ্রামে রাত্রিযাপন করেন। সকালে উঠেই তিনি বেরিয়ে পড়েন পাড়া বেড়াতে। সাথে ছিলেন তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, তাঁর স্ত্রী পেপি সিদ্দিক, তাঁদের মেয়ে লিলা তুলি সিদ্দিক ও ছেলে কায়াস মুজিব সিদ্দিক। এসএসএফ’এর অনুরোধ উপেক্ষা করে সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী চড়ে বসেন একটা রিকশাভ্যানে। কায়াস মুজিবকে কোলে নিয়ে ভ্যানের সামনের দিকে বসেন শেখ হাসিনা। তাঁর বাম পাশে ববি, পেছনে ববির স্ত্রী ও কন্যা। যেতে যেতে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্থানে ভ্যান থামিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রাণখুলে কথা বলেন এবং তাঁদের কুশলাদির খোঁজ-খবর নেন। ভ্যানে চড়ে তারা এক কিলোমিটারের মত পথ যান। আর সবাইকে অবাক করে ফেরার পথে এই এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসেন প্রধানমন্ত্রী।
এই ছবিটা দেখে অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন পুলিশের মারপিট নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বলে লেখা হয়নি। পরে দেখলাম আমি যা লিখতে চেয়েছিলাম, তা অনেকেই লিখে ফেলেছেন। আর এই ছবি দেখে আমার ভালো লেগেছে, তবে চমকাইনি একটুও। শেখ হাসিনা এমনই মাটিসংলগ্ন, শিকড়সন্ধানী। শেখ হাসিনার এমন ছেলেমানুষীর আরো অনেক ছবি বহুল প্রচারিত। ছেলের জন্মদিনে পোলাও রাঁধতে রান্নাঘরে, গণভবনের লনে ব্যাডমিন্টন খেলতে নেমে যাওয়া, বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি- তালিকা অনেক লম্বা। এই কদিন আগে ডাভোসে ছোট বোন শেখ রেহানার মাথায় তুষার ঢেলে দেওয়ার ছবিও ভাইরাল হয়েছে। আর টুঙ্গীপাড়া তো তার জন্মস্থান। মধুমতির তীরে কেটেছে তার শৈশব। এখানে এলে তাঁকে নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসতেই পারে। ভ্যানে চড়ে শেখ হাসিনা কোথায় যেতে চেয়েছিলেন?
আমার ধারণা, তিনি আসলে শৈশবে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। নিশ্চয়ই তাঁর মনে ছিল হাজার স্মৃতির ভিড়। টুঙ্গীপাড়ার এই প্রকৃতি, এই খোলা প্রান্তর, উদার আকাশ, মধুমতি থেকে ভেসে আসা হাওয়া- এইসব তাঁকে একটু ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই পারে। এই প্রধানমন্ত্রিত্ব, এই দলের সভানেত্রিত্ব, বিশ্বে বাংলাদেশকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করা, রাজনীতি, রামপাল- এতকিছুর বাইরে শেখ হাসিনার মধ্যে একটা দারুণ আটপৌড়ে ব্যাপার আছে। আমি নিশ্চিত এসএসএফ একটু ছাড় দিলে এমন আরো অনেক মন ভালো করা ছবি পাওয়া সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর ভ্যানভ্রমণ নিয়ে ফেসবুকে ছিল দারুণ উচ্ছ্বাস। কিন্তু ভ্যানচালক ইমাম শেখকে বিমানবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার পর ঘুরে গেছে আলোচনার সুর, পাল্টে গেছে হাওয়া। যেন গ্রামের একটি বেকার ছেলেকে চাকরি দিয়ে মহা অন্যায় করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীকে ভ্যানের যাত্রী হিসেবে পাওয়াটা যে কোনো ভ্যানচালকের জীবনের স্বপ্ন। সৌভাগ্যবান ইমাম শেখ ভাড়া তো নেনইনি, উল্টো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ইচ্ছা ছিল শেখের বেটিকে পেলে একটা চাকরি চাইবেন আনন্দের আতিশয্যে আসল কথাটাই ভুলে গিয়েছিলেন ইমাম শেখ। তবে শেখ হাসিনা ভোলেননি। ফিরে এসেই ‘যোগ্যতা অনুযায়ী’ ইমাম শেখের একটা চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। খেয়াল করুন, ইমাম শেখের চাকরি হয়েছে তার যোগ্যতা অনুযায়ী। পত্রিকায় পড়েছি ইমাম ফাইভ পাস বা এইট পাস। তার মানে পিয়ন, সহকারী, এমএলএসএস এ ধরনের কোনো পদে তার চাকরি হয়েছে। কিন্তু ইমাম শেখকে চাকরি কেন দিলেন প্রধানমন্ত্রী, এই নিয়ে শোরগোল সামাজিক মাধ্যমে, নানা ট্রল, নানা কটাক্ষ। কেউ লিখলেন ভ্যান থেকে বিমান। মনে হচ্ছে বিমানবাহিনীতে পাইলট ছাড়া কোনো পদ নেই, ওথানে সবাই বিমান চালায়। আর ভ্যান চালক ইমাম শেখ কাল থেকেই বিমান চালানো শুরু করবে। প্রধানমন্ত্রী তার ভ্যানে না চড়লেও একটু চেষ্টা তদ্বির করলে গোপালগঞ্জের ছেলে হিসেবে এ ধরনের একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারতেন ইমাম। কিন্তু এখন সবাই যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তাতে বেচারা ইমামের জন্য মায়াই লাগছে। বাঙালি পরশ্রী ও পরস্ত্রীকাতর, এটা জানতাম; তবে এতটা এটা জানতাম না। গ্রামের একটা স্বল্পশিক্ষিত বেকার যুবকের চাকরি পাওয়াটা আনন্দের উপলক্ষ হওয়ার কথা। কিন্তু সবাই যেভাবে হিংসা, ইর্ষা, কটাক্ষ আর বিদ্বেষের বিষ ছড়ালেন ফেসবুকে তা অবিশ্বাস্য। কেউ কেউ জীবনের লক্ষ্য হিসেবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের পাশাপাশি ভ্যানচালক হওয়া লিখেছেন। কেউ সব ছেড়ে টুঙ্গীপাড়ার রাস্তায় ভ্যান চালানোর পরিকল্পনা করছেন। মজা করেন ভালো। কিন্তু আপনার মজার টার্গেট যখন একটা স্বল্পশিক্ষিত তরুণ, তখন বড় নিষ্ঠুর মনে হয়। শেখ হাসিনাকে কাবু করতে গিয়ে তো আপনারা ভুলে ইমাম শেখকে ঘায়েল করে ফেলছেন। আমার মনে হয় এত লোকের বদ দোয়া নিয়ে ইমাম শেখের চাকরিটা করতে পারবেন না। হয় তিনি চাকরিটা ছেড়ে দিন নয়তো তাকে চাকরিচ্যুত করা হোক। তাহলে অনেক মানুষের কলিজা ঠাণ্ডা হবে। গ্রামে ভ্যান চালিয়ে তার চলে যাবে। নইলে ধরাধরি করলে এমনিতেও একটা চাকরি পেয়ে যাবেন।
এটা ঠিক বাংলাদেশে ইমামের মত বা ইমামের চেয়ে অনেক অনেক যোগ্য লোক চাকরির খোঁজে পথে পথে ঘুরছে। তারা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ছোট দেশ, মানুষ বেশি, চাকরি কম। তাই বেকারের সংখ্যা অনেক। তাদের সবার সাথে প্রধানমন্ত্রীর দেখা হবে না। প্রধানমন্ত্রী নিজে তাদের সবাইকে চাকরি দিতে পারবেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা তো শুধু টুঙ্গীপাড়া বা ইমাম শেখের প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী। দেশে এখন বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক স্পেস নেই, ভিন্নমতকে দমন করা হয় নিষ্ঠুরভাবে। যে মানবিক শেখ হাসিনা ইমাম শেখকে ডেকে চাকরি দেন, সেই শেখ হাসিনার সরকারের পুলিশই সুন্দরবন বাঁচানোর দাবিতে রাস্তায় নামা বৃদ্ধ মিজানুর রহমানকে বেধড়ক পিটিয়ে টেনেহেচড়ে নেয়। সেই পুলিশই দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিক ঈশান আর আলিমকে গরুর মত পেটায়। শেখ হাসিনার ভ্যানে চড়ার ছবির পাশাপাশি পুলিশী নির্যাতনের ছবিও ভাইরাল হয়। তারপরও এটা মানতে দ্বিধা নেই, গত এক দশকে বাংলাদেশের দারুণ উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। দারুণ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশের দিকে। গড় আয়ু বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কর্মসংস্থান বেড়েছে, বেকারত্বের হার কমেছে। তরুণদের অনেকে এখন আর চাকরির আশায় বসে থাকেন না; কেউ খামার করে, কেউ আউটসোর্সিং করে, কেউ অ্যাপস বানিয়ে নিজেদের ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন। এসব তো শেখ হাসিনারই কৃতিত্ব। এক ইমামকে চাকরি দিচ্ছেন, কিন্তু এমন লাখো ইমাম তো দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির সুবিধা পাচ্ছেন।
গ্রামে একটা কথা আছে, ধরে আনতে বললে বেধে নিয়ে আসে। শেখ হাসিনা হয়তো বলেছেন, ইমামকে চাকরি দিতে। ব্যস বিমানবাহিনীর লোক গিয়ে ভ্যানসহ চালককে নিয়ে এলো। প্রধানমন্ত্রী চড়েছেন, তাই এই ভ্যান আর রাস্তায় চলবে না, জাদুঘরে পাঠাতে হবে। কী আশ্চর্য! যেন শেখ হাসিনা আর কখনো ভ্যান বা রিকশায় চড়েননি। ১৯৮১ সালে দেশে আসার পর গত ৩৫ বছরে শেখ হাসিনা গোটা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন; কখনো গ্রামের আলপথে পায়ে হেঁটে, কখনো তপ্ত রাজপথে, কখনো গাড়িতে, লঞ্চে, ট্রেনে, বিমানে। শেখ হাসিনার সব বাহন জাদুঘরে রাখতে হলে আসলে গোটা বাংলাদেশকেই ‘শেখ হাসিনা জাদুঘর’ ঘোষণা করতে হবে। যেই অতি উৎসাহী পুলিশ সাংবাদিকদের পিটিয়েছে, তিনি যেমন সরকারের জন্য ক্ষতিকর;, যিনি শেখ হাসিনাকে বহনকারী ভ্যান জাদুঘরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনিও তেমন ক্ষতিকর। সব সময় এই অতি উৎসাহী লোকদের থেকে দূরে থাকতে হবে। আর সেই অতি উৎসাহীকে খুঁজে বের করে দূরে রাখতে হবে। শেখ হাসিনার জার্নি বাই ভ্যান ও ইমাম শেখের চাকরি পাওয়া যদি এক মণ দুধ হয়, তাহলে ভ্যান জাদুঘরে রাখার সিদ্ধান্ত হলো এক ফোটা চনা। অনেকে বলছেন, শেখ হাসিনার ভ্যানে চড়া, ইমাম শেখের চাকরি পাওয়া সবই পুর্ব পরিকল্পিত, স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী করা। যদি হয়ও, আমার আপত্তি নেই। আমার ভালোই লেগেছে। খালি স্ক্রিপ্টের ফিনিশিংটা ভালো হয়নি। বাড়াবাড়ি কখনোই ভালো নয়, কোনোক্ষেত্রেই না।
প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
probhash2000@gmail.com
source : poriborton.com