এখনও অগোছালো
মেলার সাজসজ্জা নিয়ে পাঠকের অসন্তোষ থাকলেও, তারা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই মেলা ঘুরে বই দেখছেন ও কিনছেন। পর পর দুটি ছুটির দিন শেষে গতকাল মেলায় লোকসমাগম ছিল কম। মেলার আগে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, মেলার দুই প্রবেশ তোরণ টিএসসি ও দোয়েল চত্বরে ডিজিটাল স্ক্রিন লাগানো হবে। মেলার পাঁচ দিন পার হলেও সে স্ক্রিন নজরে আসেনি। তোরণটিও দৃষ্টিনন্দন নয়। মেলার ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, হেঁটে চলার পথটিতে যে ইট বিছানো হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। অনেক প্রকাশকই নিজ খরচে ইট বসিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করে নিয়েছেন। মেলার নান্দনিকতার জন্য উদ্যান অংশে ফোয়ারা স্থাপন করা হলেও, পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও সেখানে পানি আসেনি। মেলায় পাঠকদের বিশ্রামের জন্য বসার জায়গাটিও নির্ধারণ হয়নি।
উৎস প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম সমকালকে বলেন, এবারের মেলায় স্টল বিন্যাসে কিছুটা সমস্যা থাকলেও, অন্যবারের চেয়ে ভালো। তবে নান্দনিকতার দিক থেকে এবারের মেলা পুরোপুরি ব্যর্থ। এত বড় পরিসরে মেলা হচ্ছে, পাঠকরা ঘুরে ক্লান্ত হলেও তাদের বসার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এসব ত্রুটি দ্রুত মিটিয়ে ফেললে, এবারের মেলা আরও সুন্দর হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, মেলার ব্যবস্থাপনা সহযোগী নিরাপদ ইভেন্টসের সঙ্গে আমরা শনিবার বৈঠক করেছি। আশা করছি, আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চটি এবার আমরা প্রথমবারের মতো করছি। আমরা বলেছি, মঞ্চে লেখকসহ তিনজন উঠবেন। বাকিরা নিচে থাকবেন। কিন্তু সবার মাথায় নজরুল মঞ্চটি থাকায়, এ বিষয়টি সবাই ভুলে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, আমরা বড় আকারের ছাতি দিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসার ব্যবস্থা করলেও চেয়ারগুলো ঠিক জায়গায় থাকছে না।
নিরাপদ ইভেন্টসের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ফোয়ারাটি আজকের (রোববার) মধ্যেই চালু করতে পারব বলে আশা করছি। মেলায় আগতদের জন্য বসার চেয়ারের ব্যবস্থা করা হলেও সেগুলো অনেক প্রকাশনা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও আমরা অভিযোগ পেয়েছি। আর সাজসজ্জার মান নিয়ে যে কথাগুলো বলা হচ্ছে, তা মানতে পারছি না। বরং সাজসজ্জার ব্যাপারে আমরা সব জায়গা থেকেই প্রশংসা পাচ্ছি।
গতকাল মেলায় দেখা হলো কবি-কথাসাহিত্যিক ইকবাল হাসানের সঙ্গে। প্রতি বছরই মেলার আগে কানাডা থেকে প্রাণের টানে ছুটে আসেন তিনি। এ বছর তার সাতটি বই প্রকাশ পাচ্ছে। তিনি জানান, এরই মধ্যে চলে এসেছে তিনটি বই। সময় প্রকাশন থেকে এসেছে ‘আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালী মাছ’, পরিবার থেকে এসেছে ‘প্রেম বিরহের অনুকাব্য’ ও রয়াল পাবলিশার্স থেকে এসেছে ‘একদা চৈত্রের রাতে’। প্রতিটি বই দারুণ চলছে বলে জানান বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত এ লেখক।
রিজিয়া রহমানের ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ এসেছে ইত্যাদিতে। দুই খণ্ডের বইটি শুরুতেই পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছে। সৈয়দ ইকবাল সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম’ বইটি প্রকাশ করেছে রয়েল পাবলিশার্স। অন্যপ্রকাশে চলছে মোহিত কামালের ‘বিষাদনদী’, অকাল প্রয়াত কবি মাহবুবুল হক শাকিলের ‘জলে খুঁজি ধাতব মুদ্রা’ বইটি প্রকাশ করেছে অন্বেষা। মুজিব ইরমের ‘চম্পূকাব্য’ চৈতন্যে আসার পরই কবিতা প্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। সময় প্রকাশিত জনপ্রিয় লেখক সুমন্ত আসলামের ‘হাফ সার্কেল’ চলছে ভালোই। ‘রক্তজবাদের কেউ ভালোবাসেনি’- আগামী প্রকাশিত মৌলি আজাদের এই বইটিও পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছে।
নতুন বই: মেলার তথ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মেলার পঞ্চম দিনে ৮৭টি নতুন বই প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে- গল্প ১৪, উপন্যাস ১২, প্রবন্ধ ৫, কবিতা ২৫, গবেষণা ১, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ৩, জীবনী ১, রচনাবলি ১, মুক্তিযুদ্ধ ৪, বিজ্ঞান ২, ভ্রমণ ১, ধর্মীয় ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ৫ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর নতুন বই এসেছে ১০টি। এ ছাড়া সাতটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে শহীদ-কন্যা ডা. নুজহাত চৌধুরীর ‘এ লড়াই অনিবার্য ছিল’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি। আরও উপস্থিত ছিলেন শহীদ-জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী।
মেলায় আসা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে ছিল হুমায়ূন আহমেদের ‘রচনাবলী নয়’, অন্যপ্রকাশ; মুনতাসীর মামুনের ‘উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গের থিয়েটার ও নাটক’, সময়; দন্তস্য রওশনের ‘ভূত টূত এলিয়েন টেলিয়েন’, বিদ্যাপ্রকাশ; সুদীপ্ত সালামের ‘বঙ্গবন্ধুর উক্তি’, বিদ্যাপ্রকাশ; হাবিবুল্লাহ ফাহাদের ‘তিন যোদ্ধার মুখোমুখি’, বিদ্যাপ্রকাশ; সাহাদাত পারভেজের ‘গজারিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’, উৎস; ইমদাদুল হক মিলনের ‘ছোট্ট হরিণ ও ইলিশ মাছ’, পাঞ্জেরি; ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘আবারও টুনটুনি ও আবারও ছোটাচ্চু’, পার্ল; মোস্তফা কামালের ‘প্রিন্স উইলিয়ামের আংটির খোঁজে’, অনন্যা; আনিসুল হকের ‘হাসির গল্প সমগ্র’, অন্বেষা প্রকাশন; শাহীন চৌধুরীর ‘ত্রিচারিণী’, তরফদার প্রকাশনী।
মেলামঞ্চের আয়োজন: গতকাল মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘আহসান হাবীব জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি তুষার দাশ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. অনু হোসেন ও ড. তারেক রেজা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক জুলফিকার মতিন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সালমা আকবর, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, লাইসা আহমেদ লিসা ও অণিমা রায়।
আজকের আয়োজন: আজ গ্রন্থমেলার ষষ্ঠ দিনে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন স্বরোচিষ সরকার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অধ্যাপক আহমদ কবির, অধ্যাপক দানীউল হক ও হাকিম আরিফ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ড. গোলাম মুরশিদ। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।