নির্বাচনের ‘মোড়ক উন্মোচন’

 In খোলা কলাম

সব যুদ্ধেরই কিছু রণকৌশল থাকে। মিত্রেরও থাকে, শত্রুরও থাকে। যুদ্ধে তারই জয়ের সম্ভাবনা থাকে, যে প্রতিপক্ষের রণকৌশল আগে-ভাগেই যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করে এবং সেই মোতাবেক রণাঙ্গন পরিচালনা করে। একাত্তরের বিরোধীশক্তির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ বাংলাদেশের একাত্তর-বান্ধব সরকার বিগত বছরগুলোতে চালিয়ে এসেছে, তাতে তাঁরা অনেকটাই সফলকাম হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। ক্ষমতায় থেকে এই যুদ্ধ পরিচালনা করেছে বলেই হয়ত এই যুদ্ধে অনেকটা সফলকাম হওয়া সম্ভব হয়েছে। এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে বর্তমান সরকারের আগামীতেও ক্ষমতায় থাকাটা ‘জঙ্গী-মৌলবাদ’ দমনের পূর্বশর্ত হিসেবে ধরে নেয়া যায়। এর বিচ্যুতিতে বাংলাদেশে আবারো যে একাত্তরের হায়নাদের রাজত্ব শুরু হতে পারে, তা সন্দেহাতীতভাবে ধরে নেয়া যায়! নির্বাচনের এখনো অনেকটা সময় বাকি থাকলেও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে পরবর্তী নির্বাচনের ডামাডোল। নির্বাচনীযুদ্ধকে আওয়ামী লীগ সরকার কিভাবে নিচ্ছে, তার প্রাক কিছু আলামত এরই মধ্যে দৃশ্যমান হচ্ছে এবং তা যে খুব একটা সুখকর কিছু বয়ে আনবে, অন্তত এই মূহুর্তে তা বলা যাচ্ছে না।

শাহবাগ আন্দোলনের তারুণ্য যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে এবং মৌলবাদবিরোধী যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল, তাতে অনেকাংশে পর্যুদস্ত হয়েছিল মৌলবাদী হেফাজত, জামাতসহ তাদের ‘বি-টিম’ বিএনপি। তারই ধারাবাহিকতায় বেশকিছুটা পথ এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে সরকার। ফলশ্রুতিতে জঙ্গীনিধন ও মৌলবাদ প্রতিহতে বাংলাদেশ বিশ্বের বাহবা কুড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেকক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও সরকারকে সেজন্য দিতে হয়েছে চড়া মূল্য। অনেকে এটাকে সরকারকর্তৃক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধনের কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করলেও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এটা যে মূলত স্বাধীন সোনার বাংলা গড়ার পূর্বশর্ত ছিল, তা অনেকে ভুলে যাবার ভান করেছেন বিভিন্ন সময়ে। এ কারণে সরকারকে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বেকায়দায় ফেলতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অনেকাংশে সফল হলেও দৃঢ়চেতা সরকারকে খুব একটা কাবু করতে পারেনি। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারও বিরোধীদের মুখে ছাই দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল, যার একচ্ছত্র বাহবার দাবিদার নিঃসন্দেহে জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতি-আক্রমণের কৌশল হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ও ধাপে বিএনপি নেতৃত্বাধীন একাত্তরবিরোধী মৌলবাদীশক্তিগুলো ‘আস্তিকের বিরুদ্ধে নাস্তিকের’ অর্থাৎ ‘ইসলাম রক্ষায় কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার-প্রচারণা করছে, যা ছিল শুধুই মিথ্যাচারের বেসাতি। ব্লগার হত্যা, লেখক-প্রকাশ হত্যাসহ বিদেশিরাও প্রাণে রক্ষা পায়নি তখন। তারপরেও তারা হালে পানি পায়নি। এই অপপ্রচারের কাজে তারা ব্যবহার করছে দেশের ভিতরেরই ঘাপটি মেরে থাকা বিভিন্ন ফ্রন্টকে। হা-হাভাতে কিছু বুদ্ধিজীবী, সুবিধাভোগী কিছু মিডিয়া ছিল এই অপপ্রচারণার সর্বাগ্রে। সবই তারা করেছে সরকারকে দমিয়ে দেয়ার জন্য, ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য। কিন্তু লাভ হয়নি! এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং চৌকষ রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপগুলো বার বার বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে দিয়েছে অবধারিত বিপদ থেকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় নির্বাচনের ‘মোড়ক উন্মোচন’ হয়েছে মূলত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিয়ে আলোচনায় ও তর্কবিতর্কের মাধ্যমে। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আপাতদৃষ্টিতে মাননীয় রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তা মিটলেও, বিরোধী শিবির স্বভাবগত প্রথায়ই এর বিরোধীতা করছে। তবে আশার আলো এই যে, যে প্রক্রিয়ায়ই হোক না কেন ‘শেষমেষ বিএনপি ও তার জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হলেও অন্তত আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে’, এ ব্যাপারে পক্ষ-বিপক্ষের তাবৎ বোদ্ধাসমাজ মোটামুটি একমত হতে পেরেছেন। তাছাড়াও, গত নির্বাচনে বিএনপির যে জামায়াতবান্ধব মনোভাব ছিল, তা থেকে তারা মানসিকভাবে হলেও কিছুটা সরে আসা-তে অনেকে এটাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের এই মনোভাব যে শুধু নির্বাচনবান্ধব, তা নয়; একই সাথে বিএনপির ভোটব্যাঙ্ককে কিছুটা ‘মোটাতাজা’ করবে বলেও অনেকে মনে করছেন। তবে এর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডে হতাশ হচ্ছেন অনেকে। নিকট অতীতে, ক্ষমতায় থেকে আমজনতাকে অবজ্ঞা ও অত্যাচার করা পঁচাত্তরোত্তর শাসকদের অণুশীলিত একটা সংস্কৃতি ছিল। বর্তমান সরকার সেইসব শাসকদের চেয়ে ভিন্নধর্মী এবং একাত্তরের চেতনার ধারক-বাহক সরকার হিসেবেই পরিচিত ও সমাদৃত। কিন্তু অতিসম্প্রতি এই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বের দ্বারা জনগণের বিরুদ্ধে নিপীড়নের যে চালচ্চিত্রের খবর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আমরা দেখছি, তা নির্বাচন প্রাকঃকালে আওয়ামী লীগের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্মই হয়েছিল সরকারবিরোধী আমজনতার দল হিসেবে। বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যতটা ‘সহজাত’, ক্ষমতায় থেকে বোধকরি ততটা নয়। এর পূর্বেও দলটি যতবার ক্ষমতায় গিয়েছে, অযৌক্তিক ও অসহিষ্ণু আচরণের কারণে তারা ‘গণধিকৃত ও প্রত্যাক্ষিত’ হয়েছে। এবারও তার আলামত দেখা যাচ্ছে নির্বাচনের বেশ আগেভাগেই। কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগারদের নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে কুষ্টিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন মারা গেছেন। চারজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ইশ্বরদীতে। সাম্প্রতিককালে সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগের একজন মেয়রের গুলিতে নিহত হয়েছেন একজন সাংবাদিক। এই তিনটি ঘটনাই ঘটেছিল নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে। এগুলো যে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা তা নয়। সর্বক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমে খবরগুলো না এলেও এ ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ‘অন্তর্দ্বন্দ্বের’ আভিধানিক যে অর্থ, তার সম্পূর্ণটার প্রয়োগই দেখা যাচ্ছে সরকারের বৃহৎ এই দলটিতে। এছাড়াও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটছে কিছু না কিছু। যে সরকার আপামর জনতার সরকার, সেই সরকারের আমলে এবং হাতে যখন সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তখন জনতার আদালতে তা নিঃসন্দেহে ক্ষমার অযোগ্য বলেই বিবেচিত হয়।

বর্তমান সরকারের সাফল্য প্রায় সব সেক্টরেই দৃশ্যমান। অর্থ-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও খাদ্য, শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, সড়ক ও সেতু, বিজ্ঞান ও আইটি সেক্টর ছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যে অভূতপূর্ব সাফল্য এই সরকার দেখিয়েছে, তা স্বাধীনতা-উত্তর কোন সরকারই দেখাতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই। অথচ এতো সফলতার পরেও বিভিন্ন নৈমত্তিক ঘটনায় সরকার শত-পা পিছিয়ে যাচ্ছে নিজ দলীয় কিছু ‘নষ্টদের’ কারণে। ভুইফোঁড় এসব নব্য-আওয়ামী লীগার যুগে যুগেই ছিল এই দলটিতে। এদের ভিতর একদা ছিলেন ‘খন্দকার মোস্তাক’। নির্বিচারে জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের ‘আওয়ামীকরণ’ করাটাও ইদানিং নৈমত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ যে ‘দুষ্টুচক্র’ এসব করছে, তাদের থেকে আজো আওয়ামী লীগ বেরিয়ে আসতে পারেনি। যে দলটির ঐতিহাসিক গৌরবময় একটা ইতিহাস রয়েছে, সেই দল কেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে না, তা অনেকের কাছেই আজ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন!

টেকসই উন্নয়নের প্রাকঃশর্তই হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রধান এবং বড় শরিকদল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল সুশাসন প্রতিষ্ঠার রূপরেখা। সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে বাংলাদেশ যে উন্নয়নের ধারায় প্রবাহমান, নিঃসন্দেহে তা ঈর্ষণীয়! কিন্তু এই দলটির উঁচু থেকে নীচু স্তরের বিভিন্ন নেতৃত্বের অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডে সব অর্জনই আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। এই চক্রটি যেন আঁটঘাট বেঁধে নেমেছেন হাসিনা-সরকারের সব ইতিবাচক অর্জনগুলোকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে। আওয়ামী লীগের ভিতরের এই ‘নষ্টগোষ্ঠী’র কর্মকান্ড দেখে ভিন্নকিছু ভাবার অবকাশ নেই। অনেক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বেশ অসহায় মনে হয়। উনি এই তরীতে একজন ‘একা-যাত্রী’, তা বোঝা যায় যখন অন্যান্য নেতানেত্রীরা বিপরীতমুখী স্রোতে নিজেদের প্রবাহিত করেন। আওয়ামী লীগের অনেকেই হয়ত মনে করেন, ‘এই সুসময় আজীবনের জন্য’। কিন্তু নির্বাচনের প্রাকঃমূহুর্তে তাদের এই জনবিরোধী কর্মকান্ডই যে তাদের দিকে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে এবং সে ব্যাপারে তাদের উদাসীনতা দেখলে যে কারোর মনেই ক্ষোভ আর ঘৃণার উদ্রেক হতে পারে। এদের কর্মের ফল নির্বাচনোত্তর আওয়ামী লীগের উপর না পড়ার যৌক্তিক কোন কারণ অন্তত আমি দেখিনা।

বিশ্ব রাজনীতি ‘ট্রাম্প’ তান্ডবে যখন এলোমেলো, তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও আগামী নির্বাচনে তার কিছুটা প্রভাব পড়বে বলেই ধরে নেয়া যেতে পারে। নতুন করে সবকিছু ভাবা এবং সেমতে ঘর গুছিয়ে নেয়ার জন্য যে প্রজ্ঞার দরকার, তা সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে এখনই। একই সাথে আগামী নির্বাচনে প্রচ্ছন্ন দিকনির্দেশনামূলক ও আচরণবিধিগত অনুশীলন দলীয়ভাবে এখন থেকেই শুরু না করলে এর নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে পড়তে বাধ্য। সরকার তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’-কে বিষয়গুলোর উপরে পর্যাপ্ত জরিপ চালিয়ে এবং সেসমতে কার্যবিধি তৈরি করতে এখনই মনোনিবেশ না করলে আখেরে তার ভয়ঙ্কর খেসারতগুলো শুধু আওয়ামী লীগকে নয়, সারাজাতিকেই হয়ত দিতে হতে পারে!

লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

ইমেইলঃ sabbir.rahman@gmail.com

Recent Posts

Leave a Comment