বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

 In খোলা কলাম

মঈন চিশতী

‘ও আমার বাংলা মা তোর আকুল করা রূপের সুধায় হৃদয় আমার যায় জুড়িয়ে’। এ গানের সুরের রেশ ধরেই বলতে চাই বাংলা ভাষার সুরের যে ঝংকার তা অন্য ভাষায় খুঁজে পাওয়া দায়। ভাষা আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত ও নিদর্শন।

কালামে পাকের ভাষায় ‘খালাকাল ইনসানা আল্লামাহুল বায়ান। আল্লাহ মানুষ তৈরি করে কথা বলার শক্তি দিয়েছেন’। এই শক্তির নামই ভাষা। পৃথিবীর সব ভাষাই আল্লাহর ভাষা এবং তার নিদর্শন। আল্লাহ বলেন, ‘ওয়া মিন আয়াতিহি খালকুচ্ছামাওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়াখতিলাফু আলসিনাতিকুম। আর তার নিদর্শন হচ্ছে আসমান জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষার বিভিন্নতা’।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আমাদের পীর ও মোর্শেদ শাহ হাকীম মোহাম্মদ আখতার বলতেন, কেউ যদি কোনো ভাষাকে খাটো করে তাহলে তার ঈমান নবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়ে। কেন না আল্লাহর নিদর্শনকে গুরুত্ব না দেয়া আল্লাহকে গুরুত্ব না দেয়ার শামিল। প্রত্যেক জাতির ভাষাই তার বিশেষ দান। প্রত্যেক জাতির ভাষার স্বীকৃতিই তিনি দিয়েছেন সে জাতির ভাষায় নবী পাঠিয়ে। কালামে পাকে আছে ‘অমা আরসালনা মির রাসূলিন ইল্লা বি লিসানি কাওমিহি। আমি প্রত্যেক জাতির কাছে সে জাতির নিজস্ব ভাষাভিত্তিক রাসূল পাঠিয়েছি। রাসূলের শাব্দিক অর্থ দূত বা সংবাদ বাহক। ভাষা ছাড়া সংবাদ হতে পারে না। তাই রাসূল এবং ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নিজ নিজ নবী-রাসূল চিনলেই ধর্ম সংস্কৃতি ভাষাকে চেনা সহজ হয়ে যাবে। এ জন্যই মনে হয় লালন গেয়েছিলেন ‘নবী না মানে যারা মোয়াহেদ কাফের তারা’। নবীকে মান্য করা ও ভালোবাসা মহান আল্লাহর হুকুম। ‘যদি আমাকে ভালোবাসতে চাও আমার নবীর অনুসরণ কর’। মুসলিম হিসেবে সব নবী-রাসূলের আদর্শই আমাদের আদর্শ। কোরআন প্রমাণ করে, ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কারো দুর্বলতা থাকলে তার সাহায্যকারী নিয়ে নেয়া নবীদের সুন্নত। যেমন মুসা (আ.)-এর জিহ্বায় জড়তা থাকায় তিনি বলেন, ‘ওয়া আখি হারুন আর আমার ভাই হারুন, হুয়া আফসাহু মিন্নি লিসানান, তিনি আমার চেয়ে প্রাঞ্জলভাষী, ফা আরসিলহু মায়ী রুদান। তাকে আমার সহযোগী করে দিন’।

কালামে পাকের এই আয়াত থেকে বোঝা যায় নবী-রাসূলদের কথা মানুষের বোধগম্য হওয়া জরুরি। কিন্তু আমরা যে তোতা পাখির মতো কোরআন-হাদিসের বুলি আওড়িয়ে যাচ্ছি বোঝার চিন্তা করছি না কোরআনের স্থানে স্থানে যেখানে আল্লাহ লাআল্লাকুম তা’কিলুন। যেন তোমরা বুঝতে পার লাআল্লাকুম তা’লামুন। যেন কোরআন থেকে জ্ঞান আহরণ করতে পার। সেখানে নানা যুক্তি দেখিয়ে জুমার খুতবায় আজও মুসুল্লিদের বোধগম্য সমসাময়িক ভাষা প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই দেশে যেসব সুফিরা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এসেছেন তারা এ দেশের ভাষাকেই নিজের ভাষা করে নিয়েছেন। জনতার সঙ্গে জনতার ভাষায় এলিটদের সঙ্গে এলিটদের ভাষায় কথা বলেছেন। দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার কথা কে না জানে। তিনি ক্ষমতা এবং ক্ষমতাঅলার কাছ থেকে দূরে থাকতেন। ফলে জনগণ তাকে আপন মনে করে তার খানকায় ভিড় করত। এ জন্য হিংসা হতো সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের। রাজ দরবারে তাকে ডাকলেও তিনি বলতেন, রাজা-বাদশার কাছে আমার কোনো কাজ নেই, ফকিরের আস্তানাই আমার বালাখানা। তুঘলক খাজা নিজামকে তার প্রতিপক্ষ মনে করতেন। তাকে কিছু বললে জনতা বিগড়ে যাবে এ ভয়ে কিছু বলতেন না কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন কখন তাকে হেনস্থা করা যায়। তুঘলক কর্তৃক বঙ্গবিজয়ের ফলে তিনি মনে করলেন জনমত তো বিজয়ীর পক্ষেই থাকে। তাই দূত মারফত চিঠি পাঠালেন আমি দিল্লি আসার আগেই আপনি দিল্লি ছেড়ে চলে যাবেন। নতুবা আমি এসে আপনার আস্তানা গুঁড়িয়ে দেব।

চিঠি পেয়ে খাজা নিজাম জবাবি পত্রে লিখলেন ‘দিল্লি হনুজ দূরস্ত’ (দিল্লি তো বহু দূর) এ কথার হাকিকত বাদশাহ না বুঝে পরিষদবর্গকে তার বিজয়সংবর্ধনার আয়োজন করতে বলে বাইরে অবস্থান করতে থাকেন। এর মধ্যে প্রবল ঝড়ে তার অস্থায়ী প্রাসাদ ভেঙে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। কিন্তু খাজা নিজামুদ্দিন এখনও দিল্লিতে শুয়ে থেকে দিল্লিবাসীকে রূহানি শাসন করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় শাসন যারাই করুক না আমাদের রূহানি শাসকরা যথাযথ দায়িত্ব পালন না করার ফলে আমাদের কলিজার টুকরা সন্তানরা ধর্মশিক্ষা বিমুখ হয়ে আমাদের ধর্মীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ হারিয়ে আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য ভেঙে ফেলছে। সংস্কৃতি বললে অনেকেই আবার গান-বাজনা নাট্য নৃত্য বুঝে থাকেন, আসলে কিন্তু তা নয়। বিশুদ্ধ মতে সংস্কৃতি হল বিশ্বাস-রুচি অভ্যাস-আদর্শের নাম।

মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডুরান সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, ‘সংস্কৃতি সভ্যতার অভ্যন্তর থেকে আপনা আপনি উঠে আসা বিষয়’। তার মতে এখানে কোনো জিনিস জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। জাতীয় সভ্যতার প্রভাবে যেসব আদত অভ্যাস স্বভাব চরিত্র আপনা হতে গোটা জাতির মধ্যে ছড়িয়ে থাকে তাই সংস্কৃতি। জাতীয় সংস্কৃতি নাম দিয়ে কোনো জিনিস জোর করে চালু করা যায় না। এ জন্যই দেখি, এ অঞ্চলে যখন জাতীয় ঐক্যের কথা বলে উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে এই অঞ্চলের মানুষ গর্জে উঠেছে। মাতৃভাষার মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে তা সহ্য করেনি বাংলার দামাল ছেলেরা। পাড়া-মহল্লায় জনমত তৈরি করে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু সে ভাষা আজ দুখিনী বর্ণমালার সাজানো শোপিস ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের এলিট শ্রেণী ইংরেজি নিয়ে ব্যস্ত। ধর্মীয় শ্রেণী আরবি-উর্দু নিয়ে ব্যস্ত। সংস্কৃতসেবীরা হিন্দি গানের সুর নিয়ে ব্যস্ত। সিনেমাওয়ালারা বলিউডের হিন্দি ফিল্ম নিয়ে আর ঘরের বধূরা ভারতীয় টিভি চ্যানেল নিয়ে ব্যস্ত। এ যেন আশির দশকে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালের রচিত ছড়া ‘মার্কিনি কেউ কেউ রুশী/কেউ বা চীনা তাই খুশি/ দেশের ভেতর নেই দেশী’। বাংলা আমার মায়ের ভাষা মাকে নিয়ে যেমন আমাদের গর্ব তেমনি মায়ের ভাষা নিয়েও গর্ব করি। কবি ফররুখ আহমদের ভাষায় ‘মাতৃ ভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান/তাহার চেয়ে আর যে কিছু নেই যে অফুরান’। যারা এই ভাষার পরিচয়কে খাটো করে দেখে তাদের কবি আবদুল হাকিমের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তিটি স্মরণ করাতে চাই।

‘যে জন বঙ্গেতে ন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।

লেখক : প্রাবন্ধিক

email; mueenchishty@gmail.com

Recent Posts

Leave a Comment