মানসিক উৎকর্ষও জরুরি

 In খোলা কলাম
তন্ময় কুমার হীরা
চোখ মেলে তাকালে কেবল উন্নয়নই চোখে পড়ে। যেন উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ। সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়ছে। অর্থনীতির চাকা সচল হচ্ছে। দেশ দ্রুত একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চলছে। খুব খুশি হওয়ার কথা আমাদের। তবে খুশি হতে পারিনি আমরা। বরং একরাশ গভীর হতাশা ভর করছে আমাদের ওপর।
মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ না ঘটলে, বুদ্ধি ও হৃদয়ের মুক্তি না ঘটলে, মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ না জন্মালে, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি না ঘটলে পুরো উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে যায়। অর্থনৈতিক মানদণ্ড সভ্যতার মানদণ্ড নয়। সভ্যতার মানদণ্ড জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার মানদণ্ড, শিল্পসাহিত্যের মানদণ্ড। অর্থনীতিতে দেশ যত এগোচ্ছে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তত পেছাচ্ছে। নারীরা ক্রমশ ঘরমুখী হচ্ছে। সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য বাড়ছে। ধর্মবাদীরা নারী-পুরুষকে আলাদা করে দিতে চাইছে। সহশিক্ষার বিরোধিতা করা হচ্ছে। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ও শিল্প সাহিত্যের চর্চা যদি না-ই বাড়ে তবে মানুষ সভ্য হয় কী করে, সমাজ সভ্য হয় কী করে, দেশ ও জাতি সভ্য হয় কী করে? অবকাঠামোগত পরিবর্তন চোখে পড়ে। তাতে চোখ জুড়ায়, তবে মন জুড়ায় না।
দেশে ধর্মান্ধতা বাড়ছে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। আইনশৃংখলা ব্যবস্থার অবনতি ঘটছে। খুনিরা প্রকাশ্যে মানুষ খুন করছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর তালিকায় এখন বাংলাদেশের নাম। পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় নাম নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। জ্ঞান বা শিক্ষাভিত্তিক পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে দেশে, যেন পরীক্ষা আর নম্বর অর্জনই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে পাসের হার বাড়ছে, আর কমছে শিক্ষিতের হার; কমছে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ। একটি জ্ঞানচর্চাবিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে দেশে। বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি ধর্মভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর হীন প্রচেষ্টা চলছে দেশে এখন। নিরশ্বরবাদিতার অভিযোগে সম্প্রতি পাঠ্যপুস্তক থেকে ১৭টি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বাতিল করা হয়েছে (নিউইয়র্ক টাইমস, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭)। শিক্ষা এখন হতে চলছে ধর্মশিক্ষা। ধর্মশিক্ষায় আধ্যাত্মিক কল্যাণ হয়তো বা হয়, তবে জাগতিক কল্যাণ হয় না। ধর্মশিক্ষার উদ্দেশ্য ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি। আর শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ সাধন। ধর্মশিক্ষা ঈশ্বরের কথা বলে। শিক্ষা মানুষের কথা বলে। ধর্মশিক্ষা ঈশ্বরকে ভালোবাসতে শেখায়। শিক্ষা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। শিক্ষাকে ধর্মশিক্ষায় পরিণত করে আসলে শিক্ষা ব্যবস্থার মৃত্যু ঘটানো হচ্ছে। আর বিসর্জন দেয়া হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে। উন্নয়ন এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য, উন্নতি নয়। দৃশ্যমান উন্নয়নের মোহে সরকার এবং দেশ এখন বরং অবনতির পথে হাঁটছে।
তন্ময় কুমার হীরা : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
tanmaykumarhera5@gmail.com
Recent Posts

Leave a Comment