ক্ষমতা নয়, দায়িত্ববোধ হোক সংক্রামক

 In খোলা কলাম

ড. নমিতা হালদার, এনডিসি
সেদিন ছিল ৪ আগস্ট ২০১৬। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শাপলা সভাকক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বক্তৃতা করছেন। আয়োজনের উপলক্ষ ছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর। বক্তৃতার একপর্যায়ে তিনি বললেন, ‘আমার কাছে ক্ষমতা কোনো ভোগের বিষয় নয়; দায়িত্ব পালনের বিষয়।’ চমৎকৃত হলাম। তিনি যোগ করলেন, ‘একটি ভোটের বিনিময়ে মানুষ কী অর্জন করতে পারে তা মাথায় নিয়েই দেশ, জাতি ও মানুষের প্রতি কর্তব্য পালন করতে হয়। শাসন করার মতো গুরুদায়িত্ব পালনের মাধ্যমে মানুষকে ভবিষ্যৎ উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং মানুষের আশা ও চেতনাকে জাগরূক রাখতে হবে।’
বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি প্রচলনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসনে সূচনা করেছেন এক নতুন অধ্যায়। নাগরিকমুখী সেবা, তৎপর ও গতিশীল প্রশাসন আজ দেশে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আজকের জনপ্রশাসনে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বহুল আলোচিত একটি বিষয়। এমন একটি অনুষ্ঠানে জনগণের সেবক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্বিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর কথা বললেন; পরামর্শ দিলেন কাজে গতিশীলতা আনয়নের, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর্ম সম্পন্ন হলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নটি অর্জিত হয়। সৃষ্টি হয় নতুন নতুন কর্মসংস্থানের। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় প্রধানমন্ত্রী প্রায়শ বলেন, ‘যার যা কাজ সে যদি ঠিকমতো তা করে তাহলেই তো দেশটা এগিয়ে যায়।’ প্রশ্ন জাগে, আমরা কি যার যার কাজ ঠিকমতো করছি? তাহলে কেন সময়মতো নিয়োগ হয় না? কেন প্রকল্প শেষে যেটি রাজস্ব খাতে যাওয়ার সেটি না গিয়ে ঝুলে যায়?
দেশে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় দ্বারা বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষকে সেবার আওতায় আনা হয়েছে। বিধবা, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, মাতৃত্ব- এসব ক্ষেত্রে প্রতিবছরই নতুন কিছু প্রার্থী থাকেন। এ জন্য অর্থবছরের শুরুতে বরাদ্দ দেওয়া হলেও আবেদন প্রক্রিয়াকরণের নামে অর্থবছরের শেষদিকে ভাতার অনুমোদন দেওয়া হয়। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে মন্দির, মসজিদ, গির্জা ও দুস্থদের জন্য এককালীন আর্থিক অনুদানের প্রচলন আছে। তবে একইভাবে অর্থবছরের শেষে তা প্রক্রিয়াকরণ করায় ৩০ জুনে সংস্কার কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতায় অনিয়মের আশ্রয় নিতে হয়। এখানে বলা প্রয়োজন, যে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম জনসেবক প্রধানমন্ত্রীর কাছে শত শত অফিস ফাইল নিষ্পত্তি হয় দ্রুততম সময়ে; সেবা প্রদানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্চারিত গতিশীল প্রশাসনই তাই একমাত্র সমাধান।
উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের রয়েছে গুরুদায়িত্ব। প্রকল্প প্রণয়নে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা সেল রয়েছে। তড়িঘড়ি করে প্রকল্প পাস করানোর জন্য প্রায়শ অনেক অঙ্গ প্রকল্প দলিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। পরে একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পটি যখন বাস্তবায়িত হয়, তখন সময় ও অর্থ ব্যয় হয়ে যায় বহু গুণ। ব্যয় সংকোচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বশীলতা এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। উপর্যুপরি প্রকল্প সংশোধনকে তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন এবং অর্থের অপচয় ও অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন। ইদানীং আরও একটি প্র্যাকটিস দৃশ্যমান। চাহিদার ভিত্তিতে প্রাপ্ত নির্ধারিত প্রান্তিকের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় না হওয়ায় ফেরত যাচ্ছে। এতে প্রতীয়মান হয়, অপরিকল্পিতভাবে চাহিদা পেশ করা হয় এবং প্রাপ্ত অর্থ নির্ধারিত প্রান্তিকে ব্যয় করার সক্ষমতা প্রকল্পটির নেই।
আইন, নীতিমালা, বিধি-বিধানজনিত কারণে কালক্ষেপণ এবং হয়রানির বিষয়ে বলা যায়, আইনের জন্য তো মানুষ নয়; মানুষের জন্যই আইন ও বিধি-বিধান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই সেকেলে ও অপ্রাসঙ্গিক আইন তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনে এগুলো যুগোপযোগী ও সহজ করা হবে। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যে ১৯ দফা নির্দেশনা দেন, তার ১ নম্বরেই রয়েছে ‘সরকারি সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।’ এটা সত্য, দেশের প্রচলিত আইন/বিধি/নীতিমালা দ্বারা কখনও কখনও কিছু অপ্রচলিত সমস্যার সমাধান করা যায় না। তবে যে সমস্যাটি অতীতে কখনও ঘটেনি বা তার সমাধান সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানে নেই, তা সমাধানের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে ঝুলিয়ে রাখলে জনগণের দুর্ভোগ কোনোভাবেই লাঘব হয় না।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভাবনী শক্তি অসাধারণ। যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের শুরুতেই তিনি ভাবেন, কাজটি দ্বারা কী সংখ্যক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেন যে অঞ্চলে যে পণ্য ভালো উৎপাদিত হয় সে অঞ্চলে সে ধরনের শিল্প গড়ার উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সহায়তা করতে। উদাহরণ হিসেবে তিনি পঞ্চগড়ের চা বাগান ও সিলেটের ১১ রকমের লেবু উৎপাদনের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি নিজে এ দুটি কৃষিপণ্যকে উৎসাহিত করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং দেশ হয়েছে কৃষিপণ্য সমৃদ্ধ।
দায়িত্ববোধের এক চূড়ান্ত রূপ দেখেছি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শীর্ষেন্দুর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর লেখা চিঠিতে। মির্জাগঞ্জের পায়রা নদীতে সেতু নির্মাণের আবেদনকারী ক্ষুদে এই শিক্ষার্থীর চিঠি দেখেই তিনি বলেছিলেন, ‘অবশ্যই এর একটা উত্তর দিতে হবে।’ দাপ্তরিক ভঙ্গিতে উত্তরের একটা খসড়া তৈরি করে দিতেই তিনি নিজ মমতায় যুক্ত করলেন ‘আমার দোয়া নিও। তোমার বাবা, মাসহ মুরুবি্বদের সালাম ও ছোটদের দোয়া দিও। অনেক অনেক আদর নিও।’ দেশবাসী জানেন, প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠি পেয়ে শীর্ষেন্দু একজন তারকা হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। তবে গল্পটার এখানেই শেষ নয়। মিডিয়ায় বহুলভাবে প্রচারিত এ খবরটি নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রীকে খুদে বার্তায় প্রেরণ করলে তিনি ১ মিনিটের মধ্যে আমাকে উত্তর দেন- ‘তোমার উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ। সেতুটি আমাদের খুব শীঘ্রই নির্মাণ করতে হবে।’ কী আশ্চর্য! আবেগের আতিশয্যে তিনি ভুলে যাননি সেতুটি দ্রুত নির্মাণের কথা! এটাই তো ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে ৩১ তলাবিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে দেশ ও সমাজের প্রতি সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুবিধা ভোগ করবেন অথচ দায়িত্ব পালন করবেন না_ এটা হতে পারে না।’ দুস্থ ও অসুস্থ সাংবাদিকদের কল্যাণে গঠিত সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট তহবিলে অনুদান দেওয়ার জন্য তিনি বিত্তবান মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিতে হয় চাহিদার ভিত্তিতে। তবে কথা দিয়েই তিনি কোনোভাবে নিশ্চিন্ত থাকেন না। প্রমাণ হলো সাম্প্রতিককালের একটি পদক্ষেপে। মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করার পক্ষপাতী তিনি। তাই তার ব্যক্তিগত অনুবিভাগের কর্মচারীদের প্রশাসনিক বিভাগভিত্তিক কর্ম বণ্টন করে দিয়েছেন। তার দেওয়া প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি দেখার জন্যই তিনি এ বিভাজনটি করেছেন। এর ফলে দীর্ঘ বছরের পুরাতন প্রতিশ্রুতিগুলো মনিটরিংয়ের আওতায় আসায় ইতিমধ্যে গতি ফিরে পেয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়ন অর্জনকল্পে তার বহুবিধ পদক্ষেপের মধ্যে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নারীদের সংরক্ষিত আসন প্রচলন অন্যতম। তবে অভিযোগ আছে- এসব নির্বাচিত নারী সদস্য যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। গত বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলছিলেন বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের পঞ্চম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে। এদিন তিনি সুনির্দিষ্টভাবে নেটওয়ার্কের সদস্যদের কিছু দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন। নারী জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনে নানা বাধা ও অসুবিধা নিরসনের উপায় এবং তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ নির্বিঘ্ন করার কৌশল খুঁজে বের করতে বলেন। প্রতিটি স্তরে তিনি নারীর অংশগ্র্হণ দেখতে চান। জেলা প্রশাসকদের প্রতি তার ১৯ দফা নির্দেশনায় তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, ‘নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ এবং নারী-শিশু পাচার রোধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
গত বর্ষা মৌসুমে বন্যার কিছুটা প্রকোপ ছিল। উত্তরাঞ্চলে ত্রাণ সহায়তা ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনার খোঁজখবর তিনি নিয়মিতই নিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে এক সকালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. আবদুুস সোবহান গোলাপকে ডেকে বললেন, ‘শোনো, টাকা, চাল-আটা দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বন্যাদুর্গতদের বাড়িঘরে তো পানি। তারা রান্না করবে কী করে? আওয়ামী লীগের তরফ থেকে রুটি বানিয়ে বিতরণের ব্যবস্থা কর।’ তিনি নিজে নতুন নতুন দেশীয় পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ভোক্তাদেরকে তা ব্যবহারে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন পাটের ব্যাগ, পাটের শাড়ি প্রভৃতি তিনিই প্রথম ব্যবহার শুরু করেন। প্রতিবন্ধীদের ব্যবস্থাপনায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট কর্তৃক ‘মুক্তা’ নামে যে পানি পরিশোধিত ও বোতলজাত করা হচ্ছে তার একচ্ছত্র ব্যবহারকারী তিনি। প্রতিবন্ধীদের আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্ম দিয়ে তিনি নিয়মিতভাবে ঈদ ও নববর্ষে শুভেচ্ছা কার্ড পাঠান। ব্যবহৃত চিত্রকর্মের বিনিময়ে তিনি তাদেরকে একটি আর্থিক সম্মানী প্রদান করতেও ভোলেন না।
শুরু করেছিলাম বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও গতিশীলতা নিয়ে। ক্ষমতায় থাকলে দায়িত্ব পালন করা সহজ হয়, এটাই সত্য। তবে যেসব দায়িত্ব পালনে আশা জাগরূক হয়, ক্ষমতা ব্যবহার করে সেসব দায়িত্বই সর্বাগ্রে পালন করা প্রয়োজন। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে নিয়োগ যাতে উপেক্ষিত না হয়; প্রকল্প ও প্রতিশ্রুতি যেন নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় সে লক্ষ্যেই কাজ করা প্রয়োজন। কোনো কোনো রোগ সংক্রামক। সংস্পর্শজনিত কারণে তা সংক্রমিত হয়। এমন সংক্রমণ প্রত্যাশিত নয়। তবে গতিশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জনগণের সেবক অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সংক্রমিত হলেই ব্যক্তিক ও জাতীয় পর্যায়ে আশা জাগরূক থাকবে অবিরত।

প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২

Recent Posts

Leave a Comment