মন বাড়িয়ে ছোঁয়ার দিন আজ
‘হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে/ মন বাড়িয়ে ছুঁই/ দুইকে আমি এক করি না/ এককে করি দুই/ হেমের মাঝে শুই না যবে/ প্রেমের মাঝে শুই/ তুই কেমন করে যাবি?/ পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া/ আমাকে তুই পাবি’- কবি নির্মলেন্দু গুণ এমনই নিখাদ উচ্চারণে জানিয়েছেন ভালোবাসার সুখানুভূতির কথা। প্রতীক্ষার ছায়া হয়ে থাকা আর তাকে মন দিয়ে ছুঁয়ে দেওয়ার নামই তো ভালোবাসা। এক অনন্য আবেশের মৌতাতে আবিষ্ট থাকার নামই তো ভালোবাসা। হিয়ার পরশে চমকে উঠার অনুভূতির নাম ভালোবাসা। প্রখর রোদে হিমেল হাওয়ায় শীতল হওয়ার নামই ভালোবাসা। আজ মঙ্গলবার সেই অনন্য অনুভূতিকে ‘আনুষ্ঠানিকভাবে’ পালন করার দিন। আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে।
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে হবে- ‘একদা এমনই বাদলশেষের রাতে/ মনে হয় যেন শত জনমের আগে/ সে এসে, সহসা হাত রেখেছিল হাতে/ চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে।’ ব্যস্ততা আর পর্বতসম বাধা পেরিয়ে প্রিয়ার চোখে চোখ রেখে আজ বলতে হবে- ‘শুধু তোমাকেই; হ্যাঁ শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।’
বর্তমানে ভালোবাসার সময়ের বড্ড অভাব। এখন ভালোবাসা মানে ‘দুই বেডরুম, ড্রয়িং-ডাইনিং আর লম্বা বারান্দা’! এসব চিন্তাকে ছুড়ে ফেলুন না একদিনের জন্য। কবিগুরুর মতো করে বলুন- ‘দোহাই তোদের, এতটুকু চুপ কর/ ভালোবাসিবারে, দে মোরে অবসর।’ তারুণ্যের অনাবিল আনন্দ আর বিশুদ্ধ উচ্ছ্বাসে সারাবিশ্বের মতো আমাদের দেশও ভালোবাসার উৎসবে মুখর আজ। এসএমএস, ই-মেইল অথবা অনলাইনের চ্যাটিংয়ে বিন্দু বিন্দু কথামালা সম্মুখে দাঁড়িয়ে পরিণত হবে ভালোবাসার কথামালার সিন্ধুতে। নীল খামে হালকা লিপস্টিকের দাগ, একটা গোলাপ ফুল, চকোলেট-ক্যান্ডি, ছোট্ট চিরকুট আর তাতে দু’ছত্র পদ্য হয়ে উঠতে পারে আজকের দিনের উপহার। আর ফুল তো রয়েছেই, রক্তরাঙা গোলাপ! তবে ভালোবাসার দিনটি শুধুই প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য নয়। মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, ভাইবোন, প্রিয় সন্তান, এমনকি বন্ধুর জন্যও ভালোবাসার জয়গানে আপ্লুত পারে সবাই।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ভালোবাসা যেন এক ভিন্ন মাত্রা পায়। আর সে জন্যই আজকের দিনটির বর্ণনা করতে গিয়ে তার কথায় বলতে হয়- ‘যত গোপনে ভালোবাসি পরাণ ভরি/ পরাণ ভরি উঠে শোভাতে/ যেমন কালো মেঘে অরুণ-আলো লেগে/ মাধুরী উঠে জেগে প্রভাতে।’ রঙের ডালি নিয়ে সদ্য আসা ফাগুনের দ্বিতীয় প্রভাতেই এসেছে ভালোবাসার দিন। যে দিনে মনের যত বাসনা, অব্যক্ত কথা ডালাপালা মেলে ছড়িয়ে পড়বে বসন্তের মধুর হাওয়ায়। মনে লাগবে দোলা, ভালোবাসার রঙে রঙিন হবে হৃদয়। ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’ হয়ে যাদের কেটেছে প্রহর, তারা বলে দেবে- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’।
ইতিহাসবিদদের মতে, দুটি প্রাচীন রোমান প্রথা থেকে এ উৎসবের সূত্রপাত। এক খ্রিস্টান পাদ্রি ও চিকিৎসক ফাদার সেন্ট ভ্যালেনটাইনের নামানুসারে দিনটির নাম ‘ভ্যালেনটাইনস ডে’ করা হয়। ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি খ্রিস্টানবিরোধী রোমান সম্রাট গথিকাস আহত সেনাদের চিকিৎসার অপরাধে সেন্ট ভ্যালেনটাইনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মৃত্যুর আগে ফাদার ভ্যালেনটাইন তার আদরের একমাত্র মেয়েকে একটি ছোট্ট চিঠি লেখেন, যেখানে তিনি নাম সই করেছিলেন ‘ফ্রম ইওর ভ্যালেনটাইন’। সেন্ট ভ্যালেনটাইনের মেয়ে এবং তার প্রেমিক মিলে পরের বছর থেকে বাবার মৃত্যুর দিনটিকে ভ্যালেনটাইনস ডে হিসেবে পালন করা শুরু করেন। যুদ্ধে আহত মানুষকে সেবার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সেন্ট ভ্যালেনটাইনকে ভালোবেসে দিনটি বিশেষভাবে পালন করার রীতি ক্রমে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ভ্যালেনটাইনস ডে সর্বজনীন হয়ে ওঠে আরও পরে প্রায় ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে রয়েছে আরও একটি কারণ। সেন্ট ভ্যালেনটাইনের মৃত্যুর আগে প্রতি বছর রোমানরা ১৪ ফেব্রুয়ারি পালন করত ‘জুনো’ উৎসব। রোমান পুরাণের বিয়ে ও সন্তানের দেবী জুনোর নামানুসারে এর নামকরণ। এ দিন অবিবাহিত তরুণরা কাগজে নাম লিখে লটারির মাধ্যমে তার নাচের সঙ্গীকে বেছে নিত। ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রোমানরা যখন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীতে পরিণত হয় তখন ‘জুনো’ উৎসব আর সেন্ট ভ্যালেনটাইনের আত্মত্যাগের দিনটিকে একই সূত্রে গেঁথে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেনটাইনস ডে’ হিসেবে উদযাপন শুরু হয়। কালক্রমে এটি সমগ্র ইউরোপ এবং ইউরোপ থেকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে প্রায় আড়াই দশক ধরে এ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এবারও নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। রয়েছে ভালোবাসার স্মৃতিচারণ, কবিতা আবৃত্তি, গান, ভালোবাসার চিঠি পাঠ এবং ভালোবাসার দাবিনামা উপস্থাপনসহ আরও নানা কর্মসূচি। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কনসার্টেরও আয়োজন করা হয়েছে। তবে হলি আর্টিসানে হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গুলশানে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেয়নি পুলিশ।