নব্য জেএমবিতে মেডিকেল কোর
নব্য জেএমবির আহত ও অসুস্থ সদস্যদের চিকিৎসার জন্য আলাদা মেডিকেল কোর রয়েছে। উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়া একাধিক চিকিৎসক যুক্ত এর সঙ্গে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় জেএমবির আহত সদস্যদের গোপনে চিকিৎসা দিয়েছে এ কোরের সদস্যরা। অতি সম্প্রতি রাজধানীর বনানীর ১৩ নম্বর রোডে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব নতুন তথ্য পেয়েছে। গ্রেফতার এই চারজন হলো_ ডা. সানাইয়েত বিন মোস্তাফিজ ওরফে সৃজন, আজহারুল হান্নান ওরফে অরেঞ্জ, তানভীর আহমেদ তনয় ও সৈয়দ মঞ্জুরুল হাসান জিসান। সিটিটিসির একটি দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
এদিকে, গুলশান হামলায় অস্ত্র সরবরাহকারী উত্তরবঙ্গের মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজানের মধ্যে অন্তত একজন গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে বলে জানা গেছে। নব্য জেএমবির মধ্যম সারির এ দুই নেতাকে ধরতে অভিযান শুরু করেছে সিটিটিসি। গ্রেফতার চার জঙ্গি এ দুই মিজানের নির্দেশেই অস্ত্র-গ্রেনেড সরবরাহ করে। তাদের সঙ্গে তামিম চৌধুরী ও নূরুল ইসলাম মারজানেরও পরিচয় ছিল। বনানীর বাসিন্দা ডা. সানাইয়েত পাস করেছে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে। সেখানেই তার সঙ্গে
পরিচয় হয় জেএমবির সদস্য রিপন ও রাজীব গান্ধীর। তাদের মাধ্যমে সে পরিচিত হয় নব্য জেএমবির আরেক শীর্ষ নেতা আবু ইব্রাহিমের সঙ্গে। তারা সানাইয়েতকে জেএমবির জন্য মেডিকেল টিম তৈরির দায়িত্ব দেয়। ওই টিমের সমন্বয়কও করা হয় তাকে।
মেডিকেল কোরে যারা :ডা. সানাইয়েত পুলিশের কাছে জানায়, জেএমবির মেডিকেল টিমে রয়েছে ডা. আশফাক-ই-আজম, ডা. মুসা, ডা. ফয়সাল মো. তৌহিদুজ্জামান, ইকবাল ও রংপুরের প্রাইম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আশিকুল আকবর আবেশ। তাদের প্রায় প্রত্যেকেই নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত ছিল। ডা. আশফাকের ভাই প্রকৌশলী অরেঞ্জ নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য।
যেভাবে নব্য জেএমবিতে :ডা. সানাইয়েতের ভাষ্যমতে, বনানীর একটি মসজিদে ২০১২ সালের প্রথম দিকে রংপুরের বাসিন্দা আশফাক-ই-আজমের সঙ্গে পরিচয় হয়। কিছুদিন পর সাক্ষাৎ পায় আজমের ছোট ভাই অরেঞ্জ ও তার বন্ধু আবেশের। চার-পাঁচ মাস পর তারা তাকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) আধ্যাত্মিক নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানীর বই পড়তে দেয়। আবেশ ও তার আরেক বন্ধু কামাল ২০১৩ সালের দিকে সানাইয়েতকে জানায়, তাদের এক বড় ভাই রিপন বগুড়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। আবেশ ও কামাল চিকিৎসা করানোর জন্য রিপনকে রংপুরে ডাক্তার সানাইয়েতের কাছে নিয়ে আসে। চিকিৎসায় রিপন ভালো হয়ে ওঠে। আবেশ ও জেএমবির আরও কয়েকজন সদস্য এরপর সানাইয়েতকে একজন ‘আলেমের’ সঙ্গে দেখা করার কথা বলে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের’ পেছনে একটি আস্তানায় নিয়ে যায়।
এভাবে জেএমবিতে জড়ানোর পর সানাইয়েত তার পুরনো বন্ধু নাজিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে। একবার রংপুর থেকে ঢাকায় এসে নাজিম ধানমণ্ডির একটি রেস্টুরেন্টে তাকে দাওয়াত করে। সেখানে বেশ কয়েকজন তরুণকে একত্র করা হয়। তাদের মধ্যে ছিল তুরাজ, মাইমুন, রিফাত, নাজিম, নাঈম, সাফায়েত ও নাজিম। দু-একজন বাদে তাদের প্রায় প্রত্যেকের বাসা বনানী ও গুলশান এলাকায়। জঙ্গিবাদের ‘দীক্ষা’ নেওয়া এই সদস্যরা এর পর যতবার রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছে, ততবারই তাদের সঙ্গে দেখা হতো সানাইয়েতের।
সূত্র জানাচ্ছে, আশফাক ঢাকায় ডেন্টাল কলেজের ভেতর একটি মেসে থাকত। আশফাক সানাইয়েতকে জানায়, জেএমবির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করায় ডা. মুসা নামের একজনকে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, আশফাক ও তার ভাই অরেঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে তাদের মা-বাবাকে জঙ্গিবাদের পথে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। আশফাকের গ্রামের বাড়ি রংপুর সদরের দক্ষিণ কামার কাচনায়। ডা. আশফাক ও তার ভাই প্রকৌশলী অরেঞ্জ বর্তমানে কারা হেফাজতে রয়েছে। নব্য জেএমবির সদস্য অরেঞ্জের কাছ থেকে পুলিশ ‘কেন জিহাদ করব’_ এই নামে একটি বই পায়।
সিরিয়ায় গেছে কয়েকজন :সানাইয়েত পুলিশকে জানিয়েছে, এরই মধ্যে মাইমুন ও নাজিম আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে চলে গেছে। এর পর তুরাজ, রিফাত, সাম্যুর, তৌহিদ, আকিফ জিহাদের জন্য নতুন পরিকল্পনা করে। রিফাত ও জুনায়েদ সিরিয়া চলে যায়। তুরাজ যাওয়ার সময় গ্রেফতার হয়ে ফেরত আসে।
জেএমবির কর্মকাণ্ডের ওপর খোঁজ রাখেন এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সমকালকে জানান, নব্য জেএমবিতে জড়িয়ে পড়া গুলশান ও বনানীর উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের সঙ্গে পুরনো জেএমবির রিপন ও রাজীব গান্ধীর পরিচয় করিয়ে দেয় ডা. সানাইয়েত। এই গ্রুপের সঙ্গে নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য জুন্নন শিকদার ও রেদোয়ানুল আজাদ রানার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তারা নিয়মিত জুন্নন শিকদারের বাসায় যাতায়াত করত। জুন্নন বর্তমানে সিরিয়ায় রয়েছে।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জেএমবির অনেক আস্তানায় প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নানা সরঞ্জাম রাখা হতো। এ ছাড়া অনেক চিকিৎসক গোপন ট্রেনিংয়ে অংশ নিত। রাজধানীর কল্যাণপুরে আনোয়ারা গার্ডেনে জেএমবির আস্তানায় অভিযান চালানোর পর ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম পাওয়া যায়। রাজধানীতেও একটি গোপন চিকিৎসাকেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা ছিল জেএমবির। তবে হলি আর্টিসানে হামলার পর সারাদেশে জেএমবিবিরোধী কঠোর অভিযানের মুখে ভেস্তে যায় এ পরিকল্পনা।