বাবুলকে সন্দেহ ১৫ কারণে
স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় ১৫ কারণে স্বামী বাবুল আক্তারকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এসব কারণ উল্লেখ করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। সঙ্গে সন্দেহের কারণগুলো খতিয়ে দেখারও অনুরোধ জানানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানান মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন।
চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার স্ত্রী মিতু হত্যায় জড়িত থাকতে পারে_ এমন অভিযোগ করে মোশাররফ হোসেন গতকাল সমকালকে বলেন, হত্যার আগে দীর্ঘদিন ধরে বাবুল মিতুকে নির্যাতন করে আসছিল। সংসার টিকিয়ে রাখতে সব নির্যাতন সহ্য করে গেছে মিতু। মিতু হত্যার পরও এসব তথ্য অজানা ছিল মোশাররফ ও তার পরিবারের। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে মোশাররফ ও তার স্ত্রী শাহিদা চট্টগ্রামে যাওয়ার পর মিতুর ওপর বাবুলের নির্যাতনের তথ্য জানতে পারেন।
মোশাররফ বলেন, বাবুল-মিতু যে বাড়িতে থাকত, সেই বাড়ির আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে অনেক তথ্য পেয়েছি। মিতুর ছেলে আক্তার মাহমুদ মাহিরও অনেক কিছু জানত। কিন্তু বাবার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে প্রথমে কিছু বলেনি। চট্টগ্রাম থেকে আমরা জানার পর মাহিরকে জিজ্ঞাসা করলে সে সবকিছু বলে দেয় আমাদের।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার কামরুজ্জামান গত রোববার বাবুলের শ্যালিকা শায়লাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এর আগে তার শ্বশুর-শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মিতু খুনে বাবুলের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে_ এমন সন্দেহের অন্তত ১৫টি কারণ উল্লেখ করে গত রোববার লিখিতভাবে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন মোশাররফ হোসেন। সন্দেহের কারণগুলো সম্পর্কে মোশাররফ বলেন, বাবুল মিতুকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করত। নির্যাতনের কারণে নিজ বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল মিতু। বাবুলের কারণে ঘর থেকে বেরিয়ে এক রাত বাসার সিঁড়ির ঘরে রাত কাটায় মিতু। ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে ঢাকায়ও চলে আসতে চেয়েছিল মিতু, কিন্তু তাকে আসতে দেওয়া হয়নি। বাবুলের মা-বাবা কেন বাবুলকে দ্বিতীয় বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন? মিতু খুনের পর বাবুলের আচরণ দিন দিন পরিবর্তন হতে থাকে। মামলার বাদী হিসেবে বাবুল তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে না। বাবুলের চাকরি কেন গেল? বাবুল যদি দোষীই না হবে,
তাহলে চাকরি ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য কেন আবেদন করল না? স্ত্রী হত্যার পর কেন বাবুল গণমাধ্যম থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে? স্ত্রী হত্যায় তাকে জড়িয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো যদি সত্য না হয়, তাহলে কেন প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন না করে চুপ থাকল? মিতু হত্যার পর শ্বশুরবাড়িতে থাকল; পরে কী এমন হলো যে ছেলেমেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হলো। ছেলেমেয়ের সঙ্গে নানা-নানির যোগাযোগ করতে দেয় না বাবুল এবং বাবুল পরকীয়ায় জড়িত। মোশাররফ বলেন, বাবুলকে সন্দেহ করার এসব কারণ যথেষ্ট। পুলিশ এসব কারণ তদন্ত করে দেখলেই বেরিয়ে আসবে আসল খুনি।
গত সোমবার ফেসবুকে দেওয়া বাবুলের স্ট্যাটাস সম্পর্কে মোশাররফ বলেন, ‘বাবুল বুঝতে পারছে, সে হয়তো ধরা পড়ে যাবে। এ কারণে বাড়ি ছাড়ার বিষয়ে মিথ্যা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তার কাছে গিয়ে আমার মেয়ে খুন হয়েছে। সেই খুনের মামলার তদন্ত চলমান। এ অবস্থায় কেউ কি তার সঙ্গে শ্যালিকার বিয়ের কথা বলতে পারে? নিজেকে বাঁচাতে এসব মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে বাবুল।’ নাতি মাহির ও নাতনি তাবাচ্ছুমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না জানিয়ে মোশাররফ বলেন, ‘গত সোমবার মাহিরের জন্মদিন ছিল; কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। আমি ফোন করেছিলাম, কিন্তু ফোন ধরেনি।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল একাধিকবার বাবুলের মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বাবুল আক্তারকে ফের ডাকবেন তদন্ত কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, মিতু হত্যার ঘটনায় সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে ফের ডাকা হবে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার কামরুজ্জামান। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা থেকে ফিরে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি। গত রোববার ঢাকায় গিয়ে বাবুল আক্তারের শ্যালিকা শায়লা মোশাররফ নিনজাকে প্রায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘এটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। এ মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তের অংশ হিসেবে ঢাকায় গিয়ে মিতুর পরিবারের একজনের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। তাদের জবানবন্দি নিয়েছি। বাদীর কাছ থেকে শুনে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হবে। সে জন্য মামলার বাদী বাবুল আক্তারকে আবার ডাকব।’
বাবুল আক্তার ও মিতুর মধ্যে দাম্পত্য কলহের বিষয়ে শ্বশুর মোশাররফ হোসেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারে কিছু দাম্পত্য কলহ থাকে। এ কলহ কোন পর্যায়ে ছিল বা কতটুকু ছিল, তার ওপর নির্ভর করছে বিষয়টা। মূলত সব দিকের ওপর আমাদের নজর আছে। গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়া তথ্যগুলোও খতিয়ে দেখছি আমরা।’
গত বছরের ৫ জুন চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে মিতুকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। স্ত্রী খুন হওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়ায় ভূঁইয়াপাড়ায় শ্বশুরবাড়িতে এসে ওঠেন বাবুল। গত নভেম্বরে বাবুল আক্তার আদ-দ্বীন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক হাসপাতালের সহযোগী পরিচালক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। প্রায় দুই মাস আগে দুই সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছাড়েন বাবুল।