নববর্ষ ধারণ করুক বাঙালির নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়

 In খোলা কলাম

ডা. এম এ হা সা ন |

ভারতের ইতিহাসে, বিশ্বের ইতিহাসে, বিশ্বের নানা জাতির ইতিহাসে, পৃথিবীর নানা স্থানে নানা ধরনের বর্ষগণনার প্রচলন রয়েছে। এ বর্ষের হিসাব হয়েছে কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে, কোনো জাতীয় উত্থান, ধর্মের উত্থান, জাগরণ, বিজয় বা বিকাশকে উপলক্ষ করে। এ যেন পথ চলার মাঝে সময়ের পরিক্রম; সমাজ ও জাতীয় জীবনের দৈর্ঘ্যকে পরিমাপের চেষ্টা।

সার্বিকভাবে এ বিষয়গুলো নিয়ে যে প্রকৃতি বিজ্ঞান (ঘধঃঁৎধষ ঝপরবহপব) তৈরি হয়, সেটা বাংলার মাটিতে এতটা বিকশিত হয় যে তা আসাম ও ভারতের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষণা নামের ক্ষণজন্মা এক বা একাধিক নারী ছিলেন, যিনি বা যারা এ প্রকৃতি বিজ্ঞানকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা আজও বাংলাদেশ ও ভারতের ঘরে ঘরে চর্চিত হয়, অনুসৃত হয়। তবে এ ক্ষণা নারী হওয়ায় তার স্থান রাজদরবারে হয়নি। বরং একপর্যায়ে তার (অন্তত একজন ক্ষণার) জিহ্বা কেটে নেয়া হয়। ক্ষণার একটি বিখ্যাত বচন হল-

যদি বর্ষে মাঘের শেষ ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ

যদি বর্ষে ফাগুনে মা নিয়ে যায় আগনে ॥

আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৯-১০ শতকে চর্যাপদ যুগে জন্ম নেয়া ক্ষণার বচনে বাংলা মাসের উল্লেখ এবং সেসব মাসের সঙ্গে ফসলের উৎপাদন এবং সমাজ জীবনের নানা বিষয় সম্পৃক্তকরণ বাংলা সন ও মাসের প্রচলনকে হাজার বছর পেছনে নিয়ে যায়।

বাংলার মাটিতে বিভিন্ন ফলক এবং প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনে যে সনগুলো উল্লেখিত হয়েছে তা হল- শকাব্দ, গুপ্তাব্দ, ত্রিপুরাব্দ, খ্রিস্টাব্দ, সর্বসিদ্ধসন ইত্যাদি। এছাড়া বুদ্ধাব্দের কথা উল্লেখ আছে বিভিন্ন স্থানে।

শকগণের আগমন খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে হলেও শকাব্দের গণনা শুরু হয় খ্রিস্টীয় ৭৮ থেকে। বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে যোগীর ভবন নামক একটা স্থান রয়েছে। সেখানকার মন্দির গাত্রে উৎকীর্ণ আছে ‘সর্বসিদ্ধ সন ১১৪৮ (১৭৪১ খ্রি.) শ্রীসুফলা’ কথা ক’টি। কালভৈরবী মন্দির গাত্রে যে লিপি আছে তাতে ‘শ্রীরামসিদ্ধ সন ১১৭৩ (১৭৬৬ খ্রি.), শ্রী জয়নাথ নারায়ণ’ কথাটির উল্লেখ আছে। ধর্মডুঙ্গী মন্দির গাত্রে লেখা রয়েছে ‘সর্বসিদ্ধ সন ১১৪৮ সুফল’। ওই স্থানের কালভৈরব শিবলিঙ্গ মন্দির গাত্রে ‘শ্রীরামসিদ্ধসন ১১৭৩ সাল আমলে শ্রীজয়নাথ নরনারায়ণ’ বাক্যটি উৎকীর্ণ আছে (সূত্র : ‘বাংলাদেশের প্রতœ সম্পদ’, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া)।

অর্থাৎ সর্বসিদ্ধ সন এবং শ্রীরামসিদ্ধ সন দুটো একই। এ সনের গণনা খ্রিস্টীয় সনের ৫৯৩ বছর পর ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ২ সনের ব্যবধান ৫৯৩ বছর। বাংলা সনের সঙ্গে খ্রিস্টীয় সনের ব্যবধান ৫৯৩ বছর ২ মাসের মতো। এ ক্ষেত্রে পাথরে উৎকীর্ণ সনের সঙ্গে মাস উল্লেখিত না হওয়ায় তা বিবেচনায় নেয়া যায়নি। শ্রীরামসিদ্ধ সন এবং সর্বসিদ্ধ সনটি বাংলা সনের সঙ্গে অতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। যারা মনে করেন, বাংলা সন ও নববর্ষ মুর্শিদকুলি খাঁ প্রবর্তন করেছেন, তা কতটুকু সঠিক সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

খ্রিস্টীয় ৭ শতাব্দী থেকে ৯ম শতাব্দীতে মোগল ও তুর্কিরা ভারত ও বাংলা বিজয় করে হিজরি সন নিয়ে আসেন। এ হিজরি সনের সঙ্গে খ্রিস্টীয় সনের ব্যবধান ৫৭৯ বছর। এতে মনে হয় খ্রিস্ট জন্মের ৫৭৯ বছর পর হিজরি সন গণনা করা হয়েছে। একসময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা বা বাসন্তি পূজা হতো চৈত্রে। শ্রীরাম লঙ্কাভিযানের আগে এ পূজাকে নিয়ে আসেন আশ্বিনে। এ কারণে অকালবোধন কথাটির উৎপত্তি। আসলে চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের মধ্যে পার্থক্যের কারণে ১৪ বছর ব্যবধান তৈরি হয়েছে বাংলা ও হিজরি সনের মধ্যে।

বাংলা সনের শুরু হয় বৈশাখ মাস দিয়ে, আর শেষ হয় চৈত্র মাস দিয়ে। ঋতুর হিসাবে বর্ষ শুরু হয় গ্রীষ্মের তাবদাহের মধ্যে এবং বর্ষ শেষ হয় বসন্তে। অথচ বর্ষ শুরু হওয়া উচিত ছিল বসন্তের মধ্য দিয়ে; নব পত্রপুষ্প উদ্ভাসনের মধ্য দিয়ে।

বাংলা সনের উৎপত্তি এবং বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে নানা মতের প্রচলন আছে। বাস্তবতার আলোকে এ নববর্ষ বাঙালি জীবনে একটি উপলব্ধির স্থান, আত্মপরিচয়ের স্থান, প্রাণের মেলা ও উৎসবের জায়গা।

১৫৮৪ সালের ১০ থেকে ১১ মার্চ অথবা মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাদশাহ আকবর তারিখ-ই-এলাহি প্রবর্তন করেন। সেটা সম্ভবত ফারসি ফারওয়ারদিন মাসের প্রথম তারিখ ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল পানিপথ যুদ্ধের বিজয়কে মহিমান্বিত করা এবং রাজস্ব আদায় সহজ করা। এ তারিখ-ই-এলাহি শুরুতে ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে গণনা করা হয়। ওই সময় হিজরি বর্ষের চান্দ্রমাস অনুযায়ী কর আদায় করা হতো। আর ফসলের হিসাব হতো সৌরবর্ষ অনুযায়ী। এ কারণে বাদশাহ আকবর ফতুল্লাহ সিরাজি নামক একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদকে হিজরি সন ও তারিখ-ই-এলাহির মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে করবান্ধব বছর গণনা প্রদ্ধতি প্রচলনের জন্য বলেন। ৯৬৩ হিজরি সনের মহররম মাসকে বাংলা মাস ও বর্ষের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে গিয়ে বৈশাখ মাসকে বাংলা বর্ষের প্রথম মাস হিসেবে গণনা করেন ফতুল্লাহ সিরাজি। ইতিপূর্বে শক বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী চৈত্র মাস ছিল বছরের প্রথম মাস।

প্রাচীনকাল থেকে ‘সংক্রান্ত’ নামে যে অনুষ্ঠান বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকাসহ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও চীনের কোথাও কোথাও বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়, তা বাংলাদেশে চৈত্র সংক্রান্তি হিসেবে পালিত হতো। সাঁওতাল, মুণ্ডাসহ প্রোটো অস্ট্রলয়েড আদিবাসীরা এ ঋতুভিত্তিক উৎসবসহ ফসলের উৎসবগুলো আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করে। ওরাঁওরা চৈত্র মাসে যে বসন্ত উৎসব পালন করে তার নাম সরহুল। ঝুমুর রাগে নৃত্যগীতবাদ্যে সাড়ম্বরে এ উৎসব পালিত হয়। একই উৎসব পালন করে মুণ্ডারা। চাকমাদের মধ্যে চৈত্র মাসের শেষে তিন দিনব্যাপী জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়। এ অনুষ্ঠানের আকর্ষণ হল ফুল বিজু নামক অনুষ্ঠান। এটি চৈত্রের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয়। মারমা গোষ্ঠীও এমন অনুষ্ঠান উদযাপন করে।

সার্বিকভাবে সাঁওতালরা উৎসবপ্রিয় জাতি। ঋতুরাজ বসন্ত দিয়ে এদের বছর শুরু হয়। নৃত্য, গীত, বাদ্যসহ মহোৎসবে পালিত হয় স্যালগেই নামক ফাল্গুন উৎসব। চৈত্রে এরা পালন করে বোঙ্গাতোঙ্গি এবং বৈশাখে পালন করে হোম।

অতীতে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে নানা মেলা বসত, চড়কা পূজা হতো, ঘুড়ি উড়ানোসহ নানা উৎসব হতো। ঘোড়দৌড়, মোরগযুদ্ধসহ নানা ক্রীড়ার যেমন আয়োজন হতো, তেমনি গানবাদ্যের আয়োজন হতো। চৈত্র মাসের শেষ দিনে সংক্রান্তি হতো। দোকানপাটের হিসাবপত্র সেদিন শেষ করা হতো। এর আগে পৌষ মাসে পার্বণ হতো। তখন পিঠা-পুলি দিয়ে নবান্ন উৎসব হতো।

বৈশাখের প্রথম দিনে বর্ষ শুরু উদযাপন খুব বেশি দিনের নয়। ইরানিদের নওরোজের অনুকরণে এ বর্ষবরণ করা হয়। নওরোজ উদযাপিত হয় সেখানকার শীতের শেষে বসন্তের প্রথম দিনে। সেখানে শীতটা প্রায় মার্চ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। ইংরেজি মার্চ মাসের প্রথমে ফার্সি মাস ফারওয়ারদিনের শুরু। বরফ গলে কেবল নতুন ঘাস গজাচ্ছে, আপেল ও অ্যাপ্রিকট গাছে নতুন পাতা আসছে, তখনই নতুন বছর উদযাপন হয়।

বাঙালি জাতিসত্তা বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে মহাসাড়ম্বরে নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে। এটা সাংস্কৃতিক শুদ্ধি এবং বাঙালি জাতিসত্তার প্রকাশ ও বিকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

নদী অববাহিকার দেশ বাংলাদেশ। মেকং থেকে গঙ্গা অববাহিকা এবং কোচিনের নদীবিধৌত ভূমির সঙ্গে মিল রয়েছে এ অঞ্চলের। জলা ও প্লাবন অঞ্চলের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে এ দেশের মানুষের যেমন ঐক্য রয়েছে, তেমনি ঐক্য রয়েছে অস্ট্রলয়েড, দক্ষিণ মঙ্গোলয়েড এবং ভারত মহাসাগরের তীরে আসা নিগ্রয়েডদের জীবনযাত্রার সঙ্গে। জাল, নদী, মাছ ধরার নানা ফাঁদ এবং শিকারে ব্যবহৃত নানা অস্ত্র, মাছ ধরার কোঁচ, ঘাস, ধান ও শণ কাটার নানা ধরনের কাস্তে, ধান, দূর্বা, গোলপাতা, তালপাতা, হোগলপাতার নানা উপকরণ ও আবরণ, নানা ধরনের মাথাল, লাঙ্গল, ঢেঁকি ও ডোঙ্গা এদের জীবনযাত্রার উপকরণ। কলা, কন্দ, কচু, ধান ও মৎস্যভিত্তিক যে বাঙালি জীবন সেটাই তার জাতিসত্তা। এরই প্রকাশ নানা আচার-আচরণ, অনুষ্ঠান, উৎসব ও ধর্মাচারে। এ অঞ্চলের নানা পশুপাখি তাদের টোটেম হয়ে ধরা দেবে, প্রকৃতি তাদের জীবনে ছায়া ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। যাপিত জীবনের নানা প্রতীকসহ আগামীর আকাক্সক্ষা তথা সুন্দর স্বপ্নগুলো বর্ষবরণে ধরা দেবে এটাই প্রার্থিত। দেশ ও জাতির ভৌগোলিক বিবর্তনসহ সাংস্কৃতিক শুদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া উচিত নববর্ষের উৎসবে।

বাঙালি উৎসবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত উত্তরের কোচ এবং দক্ষিণের চোলদের সঙ্গে পূর্বপুরুষদের লড়াইয়ের বিষয়টি। উৎসবে ফুটে ওঠা উচিত পশ্চিমে মগধবাসীর সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রামের বিষয়টি। উত্তর ও পশ্চিমে বিস্তৃত বনাঞ্চলে কোল, ভিল, মুণ্ডা, কিরাত ও শবরদের হাজার বছরের সংগ্রামটি উঠে আসা উচিত বাঙালির শোভাযাত্রায়। সমতলের আদিবাসীর রক্ত যেমন বাংলার মানুষের শরীরে প্রবাহিত, তেমনি উত্তর থেকে আগত সাম্যভিত্তিক সমাজের দূত কিরাতপুত্র শিব এবং মানবমর্যাদায় বিশ্বাসী যুক্তিবাদী গৌতমবুদ্ধের রক্ত তাদের দেহে প্রবাহিত। তাদের আকাক্সক্ষাগুলো ফুটিয়ে তোলা উচিত এ জাতির নবপরিচয় নির্মাণে। বৈষ্ণব ধর্ম ও সুফিবাদের মাঝে জৈনধর্মসহ যে সনাতন ধর্মের প্রকাশ তা যেমন উঠে আসা উচিত, তেমনি ঝড়ঝঞ্ঝার সঙ্গে বাঙালির নিত্য লড়াই নানা প্রতীকে উপস্থাপিত হওয়া উচিত বর্ষবরণের শোভাযাত্রায়। নববর্ষ ধারণ করুক বাঙালির আদি, অকৃত্রিম, নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।

ডা. এম এ হাসান : চেয়ারপারসন, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, বাংলাদেশ

dhasan471@gmail.com

Recent Posts

Leave a Comment