মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কি শুনছেন?
সারওয়ার-উল-ইসলাম
আমার মেয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। পরীক্ষার দিনগুলোতে ওকে আমি কেন্দ্রে দিয়ে অফিসে যাই। সকাল ১০টায় পরীক্ষা। বাসা থেকে বের হই সাড়ে ৯টায়। রিকশায় পাঁচ-সাত মিনিট লাগে। হলে পৌনে ১০টার আগেই পৌঁছানো যায়।
মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের প্রধান ফটকের বাইরে ফুটপাতে প্রতিদিনই ৯টার পর থেকে ভিড় লেগে থাকে। প্রথম দিন থেকেই দেখছিলাম, অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে অধীর আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কখন ফটক খুলবে। সাড়ে ৯টায় ফটক খোলার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা হুড়মুড় করে কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করে। বাংলা ও ইংরেজির দুটি করে চারটা বিষয় শেষ হওয়ার পরে পঞ্চম পরীক্ষাটি ছিল আইসিটি। আগের চারটি পরীক্ষার দিন সাড়ে ৯টার সময় মেয়েকে প্রায় জোর করে বলতে হতো, ‘চলো, সময় হয়ে গেছে; যদি জ্যামে পড়ি, তা হলে হলে ঢুকতে দেরি হয়ে যাবে।’
মেয়ে বই নিয়েই বসে থাকত। কিন্তু আইসিটি পরীক্ষার দিন মেয়ে ৯টা থেকেই বের হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কী আর করা! ৯টা ১০-এ মেয়েকে নিয়ে বের হই। সোয়া ৯টায় কেন্দ্রে পৌঁছাই। মেয়ে রিকশা থেকে নেমেই বান্ধবীদের কাছে দৌড়ে যায়।
এখানে বলে রাখা দরকার, আমার মেয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে আসার সময় আরো তিনটা কেন্দ্র চোখে পড়ে প্রতিদিন। অন্যদিনের চেয়ে ওই দিন প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরে জটলা একটু বেশি চোখে পড়ে। শিক্ষার্থীরা গোল হয়ে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে গভীর মনোযোগ দিয়ে। বেশ কোলাহলও ছিল। অভিভাবকরা এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছেন।
তো যা হোক, আমার মেয়ে তার বান্ধবীদের কাছে গিয়ে গোল হয়ে মোবাইলে কিছু দেখছে, বেশ উত্তেজিত। কিছু একটা পেয়েছে, এ রকম চেহারায় ছাপ। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ক্ষাণিকটা আড়ালে গিয়েই। অন্য শিক্ষার্থীদের পাশে গিয়ে দেখলাম-শুনলাম। আইসিটির আংশিক প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। শিক্ষার্থীরা তা দেখে বই খুলে মিলিয়ে দেখছে।
আমি মেয়েকে কোনো কথা না বলে চলে যাই অফিসে। রাস্তায় ভাবি আমাদের শিক্ষার দুরবস্থার কথা। দুপুরে ফোন করে যথারীতি জানতে চাই, কেমন হলো পরীক্ষা? মেয়ে বলে, ভালো। এর পরের প্রশ্নটা আচমকা করে বসি, প্রশ্ন কি হুবহু ফাঁস হয়েছে? মেয়ে ক্ষাণিকটা সময় নিয়ে উত্তর দেয়, না, শুধু এমসিকিউর অংশ।
আর কিছু বলি না।
মেয়ে তার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকে। একদিন পর জীববিজ্ঞান প্রথম পরীক্ষা। পরের দিন, অর্থাৎ বুধবার পরীক্ষার কেন্দ্রে যাওয়ার সময় একই অবস্থা দেখি। সেই তিনটা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের জটলা দেখি কোনো কিছু নিয়ে। আবারও কি তা হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস! ওই দিনও মেয়ে মোবাইল যন্ত্রের কল্যাণে হয়তো কোনো বন্ধুর কাছে জেনেছে প্রশ্ন ফাঁসের খবর। তাই আগেই বাসা থেকে বের হয়েছে। কেন্দ্রের কাছে গিয়ে সেই একইভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মোবাইলের মনিটরে।
তবে বলে রাখা ভালো, আমার মেয়ে বরাবরই ভালো ছাত্রী। কিন্তু যতই পড়াশোনা করে নিজেকে প্রস্তুত করুক না কেন, যখন শোনে ও রকম ফাঁস হয়েছে, তখন পড়াশোনায় কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, মেয়ে আমার রাত ২টা পর্যন্ত পড়ে ঘুমায়। যখন ও রকম ফাঁস হওয়ার খবর শোনে, তখন ভেতরে ক্ষাণিকটা কষ্ট লাগাই স্বাভাবিক।
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আগামী বছর থেকে পরীক্ষার দিন সকালে প্রশ্ন ছাপিয়ে পরীক্ষা হবে। কেন এ বক্তব্য তিনি দিলেন? নিশ্চয়ই তিনি বুঝতে পেরেছেন, কোথায় সমস্যা। কারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকেন। যদি তাই জেনে থাকেন, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না কেন!
প্রতিবছরই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। কিংবা প্রায়ই কাছাকাছি মিলে যাচ্ছে। কেন মিলে যায়? এর জবাব কি দেবেন আমাদের শিক্ষামন্ত্রী।
একজন শিক্ষার্থী সারা বছর কষ্ট করে পড়াশোনা করবে, আর একশ্রেণির দুর্বৃত্ত, দুর্বৃত্তই বলা উচিত, তারা পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস করে কামিয়ে নেবে লাখ লাখ টাকা। কিংবা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য প্রশ্ন ফাঁসে মেতে উঠবে। আর কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনা কম করে বা একেবারেই না করে ভালো ফল করবে, এটা কি একজন অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব?
কারণ সারা বছর শুধু অর্থই নয়, সময় নষ্ট করে সন্তানের পেছনে লেগে থাকেন একজন অভিভাবক। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সন্তানের পরীক্ষা দেওয়ার মানসিকতা বাধাগ্রস্ত হলে কী পরিমাণ খারাপ লাগে, সেটা শুধু একজন সচেতন অভিভাবকই বোঝেন।
শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, এখনই কঠোর হাতে দমন করুন সেই দুর্বৃত্তদের, যারা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করায় লিপ্ত থেকে পক্ষান্তরে দেশেরই ক্ষতি করে যাচ্ছে।
প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পাচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক উন্নতি সাধন করেছে। আমরা দেশকে এগিয়ে নিচ্ছি। এত সব কথা বলার আগে শিক্ষামন্ত্রী আপনি একবারও কি ভেবেছেন, কজন শিক্ষার্থী ওই জিপিএ ৫ পেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছে। কেন পারছে না। শেষমেশ লাখ লাখ টাকা দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। টাকা দিয়ে বিবিএ, এমবিএ, এমএমএস সনদ কিনছে।
আমার কথা কি শুনছেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী?
লেখক : ছড়াকার, সাংবাদিক।