স্থানীয় সরকারে গণতন্ত্রহীনতা : আদালতই শেষ ভরসা

 In খোলা কলাম

দেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট এমন কিছু ঘটনা ঘটছে, যা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সিলেট ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এবং হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়রদের দ্বিতীয় দফায় বরখাস্ত করা হয়েছে। অবশ্য সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে পুনর্বার বরখাস্তের বিপরীতে রিটের পরপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সেই বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন। উল্লেখ্য, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জয়ী হয়ে নিজেদের চেয়ারে বসার কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের বরখাস্ত করা হয়। আমরা মনে করি, এ আচরণ একইসঙ্গে অগণতান্ত্রিক, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসিত হওয়ার অধিকারের বিরুদ্ধে অবৈধ হস্তক্ষেপ, এমনকি আদালতের রায়ের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা প্রদর্শন। এতে করে দেশের গণতন্ত্র ও সরকারি নীতির বিষয়ে বিদেশী জনপ্রতিনিধিদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাবে তা বলাই বাহুল্য। জানা গেছে, উচ্চ আদালতের আদেশে নিজেদের নির্বাচিত চেয়ার যথাক্রমে ২৩ ও ২৭ মাস পর ফিরে পান রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের দুই মেয়র। দায়িত্ব নেয়ার দুই ঘণ্টা পর সিলেটের এবং মাত্র ৮ মিনিটের মাথায় রাজশাহীর মেয়রকে ফের বরখাস্ত করা হয়। অন্যদিকে হবিগঞ্জ পৌর মেয়রকে আবারও বরখাস্ত করা হয় ১১ দিন পর।

উদ্বেগের বিষয়, তিন মেয়রই মাঠের বিরোধী দল বিএনপির নেতা। ফলে এটা যে সরকারের ভিন্নমত সহ্য করতে না পারা ও আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা তা বলাই যায়। যদিও স্থানীয় সরকার আইন-২০০৯-এর উপধারা ১২ মোতাবেক মেয়রদের বরখাস্ত করা হয়েছে; কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় তাদের দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে তা প্রশ্নের উদ্রেক করে বৈকি। বিশেষজ্ঞরা এ বরখাস্তকে রাজনৈতিক নাশকতা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অশুভ বার্তা, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দেশ ও রাজনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। আদালতের রায় নিয়ে দায়িত্ব নিতে আসবেন এটা জানার পরও রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার উদ্যোগ না নেয়া, এমনকি রাজশাহী সিটি মেয়রের কক্ষে তালা লাগানো বিশেষজ্ঞদের মতকেই প্রতিষ্ঠিত করে।

যুগান্তরের খবরে বলা হয়, সরকারবিরোধী আন্দোলনের একাধিক মামলায় চার্জশিটভুক্ত হওয়ায় ২০১৫ সালের ৭ মে বরখাস্ত হন রাজশাহীর মেয়র বুলবুল। ২০১৬ সালে নিজের পক্ষে রায় এলেও প্রক্রিয়া শেষ করে রোববার দায়িত্ব নিতে গিয়ে ফৌজদারি মামলায় ফের বরখাস্ত হলেন তিনি। অন্যদিকে সিলেটের মেয়র ও হবিগঞ্জ পৌর মেয়রকে আবারও বরখাস্ত করা হয় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত হওয়ায়। কুমিল্লায় বিএনপি প্রার্থী সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হওয়ার তিন দিনের মাথায় বিএনপিরই তিন মেয়রকে আবারও বরখাস্ত করায় এমন প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়, সরকার মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও জনমতের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জনগণ ভোট যাকেই দিক, নিজের প্রার্থী জয়ী না হলে বিরোধী প্রার্থীকে আইনের মারপ্যাঁচে কোনোভাবেই দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হবে না।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান যুগে কোনোভাবেই এমন অগণতান্ত্রিক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিতেই আমাদের স্থানীয় সরকার পদ্ধতি খুব একটা সংহত নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাধিকবার বরখাস্ত ও দায়িত্ব পালনে বাধা একে আরও ভঙ্গুর করে তুলবে। সুষম উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার কাঠামোকে দৃঢ় ভিত্তিদান, সর্বোপরি জনগণের শাসন নিশ্চিত করতে সরকারের শীর্ষ মহল ও সংশ্লিষ্টরা সব দল ও মতের জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেবে- এটাই কাম্য। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ব্যাপারে হাইকোর্ট যে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন তার ধারাবাহিকতায় এবং অন্য দুই স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে কী ঘটে আমরা তা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

Recent Posts

Leave a Comment