ব্র্যান্ডিং হবে বাংলাদেশ
প্রথমবারের মতো সবুজ সম্মেলনের (গ্রিন অ্যাসেম্বলি) আয়োজন করতে যাচ্ছে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি খুব ইতিবাচক পদক্ষেপ। অতীতে এ ধরনের কোনো সম্মেলন হয়নি। বিষয়টি দেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশও এমন সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নেবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে সবার কাছেই স্মরণীয় ও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে ঢাকা সম্মেলন।
আইপিইউ প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী গতকাল শুক্রবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বসে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এ সম্মেলন আয়োজন করতে গিয়ে নানাভাবে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, ঠিক সেই পরিমাণ কার্বন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় বহন করবে আইপিইউ। উদাহরণ হিসেবে তিনি
বলেন, সম্মেলনের কারণে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হবে, গ্রামে লাকড়ির চুলার বদলে গ্যাসের চুলা সরবরাহ করে ওই পরিমাণ কার্বন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, আইপিইউ সম্মেলনে বিদেশি প্রতিনিধিরা আসছেন। তাঁরা উড়োজাহাজে করে আসছেন। এখানে থাকবেন। গাড়িতে চলাচল করবেন। এসব কারণে কার্বন নিঃসরণ হবে। এর একটা হিসাব বের করা হবে। পরে তা নিউট্রালাইজ করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সম্মেলন চলাকালে ৩ অথবা ৪ এপ্রিল কার্বন ফুটপ্রিন্ট হিসাব করা হবে। এরপর সে অনুযায়ী ‘কার্বন নিউট্রাল’-এর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আইপিইউ কাজটি করতে চায়।
উল্লেখ্য, সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ১৩১তম সম্মেলনে জাতীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী আইপিইউর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর বাংলাদেশে এ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নেন তিনি। নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এই আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে বলে মনে করেন আইপিইউ প্রেসিডেন্ট।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবেলা : সাবের হোসেন বলেন, ‘সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ আজ বৈশ্বিক সমস্যা। শুধু সামরিক কৌশলে এটা দমন করা যাবে না। এর মূল কারণ খুঁজতে হবে। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি সংসদ সদস্যরা কিভাবে এ নিয়ে কাজ করতে পারেন, সেই কৌশল ঠিক করতে আইপিইউ নির্বাহী কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার ঢাকায় এ বৈঠক হয়। সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি খসড়া প্রস্তাবগুলো আমরা সম্মেলনে তুলে ধরব। তারপর আলোচনা সাপেক্ষে সুপারিশ গৃহীত হবে। ’ তিনি বলেন, সংসদ সরকারের কোনো সম্প্রসারণ নয়। সরকারের বাইরে সংসদের কাজ আছে। সেই বিষয়গুলো নিয়ে আইপিইউ কাজ করে। এ ক্ষেত্রে তাই করবে। সংসদগুলো একসঙ্গে কাজ করলে সারা বিশ্বে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করা সহজ হবে।
আইপিইউ টেলিভিশন : সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, এ সম্মেলনেই আইপিইউ টেলিভিশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার এ টেলিভিশন উদ্বোধন করবেন। যা বিশ্ববাসী ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখতে পারবে। এর মাধ্যমে আইপিইউয়ের কার্যক্রম জনগণের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে। এ ছাড়া কাগজের ব্যবহার কমাতে এই সম্মেলনে ‘আইপিউ ১৩৬’ নামে একটি অ্যাপও তৈরি করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সম্মেলনকে স্মরণীয় করে রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং হবে : এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও দেশকে ব্র্যান্ডিং করার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান আইপিইউ প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘সম্মেলনে ১৩২টি দেশের দেড় হাজারেরও বেশি প্রতিনিধি আসছেন। তাঁরা বিশ্বের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত বিবর্তনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করবেন। যে আলোচনায় আমাদের সংসদ সদস্যরা অংশ নিতে পারবেন। গণমাধ্যমের কল্যাণে সাধারণ মানুষও জানতে পারবেন। আর আমাদের সফল আয়োজন দেখে বিশ্ববাসী বুঝবে, বাংলাদেশ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। সাফল্য ও সম্ভাবনার দেশ। উন্নত বিশ্বের দিকে দ্রুত অগ্রসরমাণ এক দেশ। এভাবেই বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব হবে। ’
পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত : আইপিইউ সম্মেলন আয়োজনের ফলে ২৫ মার্চের কালরাতসহ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী যে বর্বর গণহত্যা চালিয়েছিল তার বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব পাস করেছি। সংসদে এ বিষয়ে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশ্বের সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংসদ সদস্যরা আসছেন। তাঁদেরকে আমরা বিষয়টি অবহিত করতে পারব। তাঁদের মাধ্যমে কূটনৈতিক তত্পরতা চালানোর সুযোগ পাব। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে আমাদের কূটনৈতিক মিশন নেই। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোতে। সেই দেশগুলোও সম্মেলনে আসছে। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
গণহত্যা দিবস নিয়ে আইপিইউয়ের নিজস্ব কোনো উদ্যোগ থাকবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বিশেষ পরিবেশনা থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের সহানুভূতি অর্জনের বিষয়টি নির্ভর করবে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের ওপর। তাঁরা বিভিন্ন আলোচনায় এবং বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট সদস্যদের সঙ্গে পারস্পরিক আড্ডায় বিষয়টি কতটা তুলে ধরতে পারেন সেটা দেখতে হবে। আইপিইউ সব ধরনের গণহত্যার বিরোধী বলে তিনি উল্লেখ করেন।