মরিবার হল তার সাধ
শান্তা মারিয়া
বিষণ্নতা, বিষাদ এই শব্দগুলো একসময় বাংলা সাহিত্যে খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু বাস্তব কথা হলো এই শব্দগুলো যতই কাব্যিক শোনাক তা একজন মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিষাদের সমুদ্রে ডুবে গিয়ে কিংবা বিষণ্নতার অরণ্যে পথ হারিয়ে মানুষের জীবন-প্রদীপ নিভে যাচ্ছে হরহামেশাই। সম্প্রতি আমরা অনেকগুলো সম্ভাবনাময় জীবনের মৃত্যু দেখেছি যারা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আখতার জাহান জলি তাদের অন্যতম।
এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘বিষণ্নতা নিয়ে আসুন কথা বলি।’ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে এই প্রতিপাদ্য।
সারা বিশ্বে ৫ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে। ১৭টি রাষ্ট্রে পরিচালিত ওয়ার্ল্ড মেন্টাল হেলথ সার্ভের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি ২০ জন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষের মধ্যে ১ জন বিষণ্নতায় ভুগছে। বাংলাদেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত।
শিশুদের মধ্যেও ১ শতাংশ বিষণ্নতায় ভুগছে। দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত। বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার প্রায় দ্বিগুণ। বিষণ্নতার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে উৎপাদন, সৃজনশীলতা। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে অন্যান্য কাজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রতিদিন তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। বছরে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। এইসব আত্মহত্যার বেশিরভাগই ঘটে বিষণ্নতার কারণে।
বিষণ্নতা নিয়ে বেশ কিছু প্রচলিত ধারণা রয়েছে। যেমন মনে করা হয় এটি দুর্বল মনের লক্ষণ। আবার মনে করা হয় যারা মুখে আত্মহত্যার কথা বলে তারা কখনও আত্মহত্যা করে না। মনে হতে পারে ভূত-প্রেত বা জিনের কারণে এমনটি হয়েছে। আবার মনে হতে পারে অলসতার কারণে বিষণ্নতা হয়েছে, ঘাড়ে কাজ চাপালে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিংবা মনে করা হয় বিয়ে দিলে বিষণ্নতা কেটে যাবে। ইত্যাদি।
তবে এ ধারণাগুলো ভুল। এই ধারণাগুলো থেকে বের হয়ে আসা খুব জরুরি। বিষণ্নতা হতে পারে ধনী-গরীব-মধ্যবিত্ত-শিক্ষিত-অশিক্ষিত-সব শ্রেণি পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতার নারী পুরুষের। অনেক পরিবারে বিষণ্নতাকে ন্যাকামি বা ঢং বলে অভিহিত করা হয়। সাধারণত নারীদের বা টিনএজ ছেলেমেয়েদের এমন সমস্যায় অভিভাবকরা অনেক সময় কড়া ব্যবহার করেন। যা রোগীকে আরও অসহায়ত্বের মধ্যে ঠেলে দেয়।
মুশকিল হলো বিষণ্নতা এই রোগটির চিকিৎসা কেবল ওষুধ নির্ভর নয়। অনেকটাই কাউন্সেলিং নির্ভর। কাউন্সেলিং দেওয়ার মতো যথেষ্ট সংখ্যক মনোচিকিৎসক বাংলাদেশে নেই। জাতীয় বাজেটে মানসিক চিকিৎসা খাতের বরাদ্দ হলো ০.৪ শতাংশ যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকই কম।
ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা নামের ভয়াবহ রোগটি থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচানো দরকার। কারণ যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে তারা যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান না হয় তাহলে কিভাবে আমরা দেশের সুন্দর ভবিষ্যত আশা করতে পারি?
আগেও বলেছি আবার বলছি, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং কলে কারখানায়, অফিসে, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন কাউন্সেলিং সেন্টার। ছাত্র শিক্ষকদের মানসিক সাহায্য, পরামর্শ দেওয়ার জন্য কাউন্সেলিং সেন্টারে প্রশিক্ষিত কর্মী থাকতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য চেক আপের পাশাপাশি মানসিকভাবে কেউ কোনো অস্বস্তিতে ভুগছে কিনা সেটিও যদি চেকআপ হয়, পরামর্শ দেওয়া হয় তাহলে অনেক অপমৃত্যু আমরা রোধ করতে পারব।
ছোট খাটো সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে হয়তো কর্মীদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তাই মতিঝিল, কারওয়ান বাজারের মতো বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের কাউন্সেলিং কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যও কিন্তু নিয়মিতই চেক আপ করতে হয়। মানুষের জীবনে আনন্দ ও বিষাদ থাকবেই। কিন্তু এই বিষাদ যদি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় তাহলে অবশ্যই তার মানসিক সাহায্য প্রয়োজন।
নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর জন্যও কাউন্সেলিং প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে অনেক নারী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। আক্রান্ত হতে পারে শিশুরাও। তাদের সকলের জন্যই দরকার কাউন্সেলিং। যেসব নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন তাদের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে কাউন্সেলিং দরকার।
গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের পর নারীরা এক বিশেষ ধরনের বিষণ্নতা বা ব্লুজ এ আক্রান্ত হতে পারেন। মেনোপজের আগে বা পরেও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন অনেক নারী। হরমোন সংক্রান্ত কারণেই এমনটা ঘটে।
বিষণ্নতার সঙ্গে শুধু শারীরিক নয়, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণও জড়িয়ে থাকে। ক্যারিয়ারের টানাপোড়েন, পারিবারিক সংকট, বেকারত্ব, অসুস্থতা, পরিবারের কোনো সদস্যের অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিশাল ব্যবধান মানুষকে হতাশাগ্রস্থ ও বিষণ্ন করে তুলতে পারে। এমনকি অনেক সময় বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও মানুষ বিষণ্নতায় ভুগতে পারে। যাদের বাড়িতে ডিমেনশিয়ার রোগী আছেন সে বাড়ির সদস্যরাও ভুগতে পারেন ডিপ্রেশনে। সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ মানুষকে সাহায্য করতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ গ্রহণ করে মানুষ বিষণ্নতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
আমাদের প্রতিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সরকারি ও বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতালে দরকার বিষণ্নতা বিষয়ক পরামর্শ ও চিকিৎসা কেন্দ্র। এই বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রচুর চিকিৎসক ও কর্মী প্রয়োজন। বিষণ্নতার কারণে যেন কোন সম্ভাবনাময় জীবন ঝরে না যায়, হারিয়ে না যায় অন্ধকারে সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন অবিলম্বে।
লেখক : কবি, সাংবাদিক।