সালিশে বিয়ে বিচ্ছেদে তরুণীর আত্মহত্যা

 In লিড নিউজ
প্রেমিক বিয়ে অস্বীকার করার পর সালিশ বসিয়ে এক তরুণীকে গর্ভের সন্তান নষ্ট এবং বিয়ে বিচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ মাতব্বররা।

এ ঘটনায় ক্ষোভে-অপমানে সালিশের রাতেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ওই তরুণী।

মঙ্গলবার দিনগত রাতে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার মহামায়া ইউনিয়নের মাটিয়াগোদা গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।

নিহত তরুণীর নাম মায়না আক্তার ফেন্সি( ১৮)।

তার সঙ্গে পাশের বাড়ির আবদুল বারেকের ছেলে হানিফ ওরফে বোমা হানিফের সাত-আট মাসের প্রেমের সর্ম্পক ছিল।

এ সময় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে হানিফ একাধিকবার ফেন্সির সঙ্গে শারীরিক সর্ম্পক গড়ে তোলেন।

ফেন্সি দেড় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে গত ২২ মে ফেনীর কদলগাজীতে নিয়ে তাকে বিয়ে করেন হানিফ।

স্থানীয় কাজী তাদের বিয়ে পড়ান। বিয়েতে দেনমোহর ধার্য করা হয় আড়াই লাখ টাকা।

এদিকে মাটিয়াগোদা গ্রামে ফেরার পর হানিফ বিয়ের কথা অস্বীকার করে এবং ফেন্সিকে দুশ্চরিত্রা বলে অপবাদ দেন।

এর প্রেক্ষিতে মহামায়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি সাহাজান মিনুর শরণাপন্ন হয়ে ঘটনার সমাধান চায় ফেন্সির পরিবার।

ফেন্সির মা মনোয়ারা বেগম জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ সাহাজান মিনু, মাটিয়াগোদা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্পাদক মীর কাইয়ুম, মিজি আলম, কাইয়ুম মেম্বার, আবুদল, সিরাজসহ কয়েকজন গ্রাম্য মাতব্বর ফেন্সির দাদার বাড়িতে যান।

সেখানে মনোয়ারা তার মেয়েকে হানিফের বাড়িতে বউ হিসেবে নিয়ে যেতে তিনি সালিশদারদের কাছে বারবার দাবি করেন।

তিনি বলেন,’তারা (সালিশদার) আমার কোনো কথা শুনতে চায়নি। তারা আমার কাছ থেকে সাদা কাগজে বৈঠকের শুরুতেই স্বাক্ষর নিয়ে নেন। কাবিন ফেরত দিয়ে ৪০ হাজার টাকা ছেলের কাছ থেকে বুঝে নেয়ার রায় দেন তারা।

মনোয়ারা বলেন, আমি সালিশদারদের বলেছি, আমরা গরিব মানুষ। ইজ্জতটুকু আমাদের সম্বল। আপনারা আমাদের ইজ্জতের দাম দিন। আমার মেয়ে ক’মাস পর সন্তানের মা হবে। আপনারা দয়া করে আমার মেয়েকে হানিফের বউ হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি দেন। আমরা টাকা চাই না।

কিন্তু সালিশদাররা হানিফকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে বিয়ে এখানেই শেষ বলে রায় দিয়ে চলে যান।

রাত ১টার দিকে সালিশদার চলে যাওয়ার পর ফেন্সি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে টানা এক ঘণ্টা কান্নাকাটি করেন বলে জানান মনোয়ারা।

তিনি বলেন, একপর্যায়ে আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সেহরির সময়ে ঘুমা ভাঙার পর দেখি আমার মেয়ে তার রুমের সিলিংয়ের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দেয়া।

এদিকে বুধবার সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এএসপি সার্কেল (ছাগলনাইয়া-পরশুরাম) আবদুল মালেক মিয়া, ছাগলনাইয়া থানার ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ্ ও পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল খায়ের শেখ।

পরে ফেন্সির লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফেনী হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।

এঘটনায় ফেন্সির মা মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন।

মামলায় বোমা হানিফসহ সালিশদারদের আত্মহত্যা প্ররোচনায় আসামি করা হয়েছে।

তবে বুধবার বিকাল পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি।

পুলিশ জানায়, বোমা হানিফ চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ্ জানান, আত্মহত্যা প্ররোচনাকারী সালিশদারদের আসামি করা হয়েছে। প্রচলিত আইনে মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।

সালিশদার মহামায়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সাহাজান মিনু বলেন, আমরা ফেন্সির মায়ের অনুরোধে রাতে তাদের বাড়িতে যাই। বিয়ের কাবিন হাতে পাওয়ার পর সামাজিকভাবে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে বলে আমরা ওই বাড়ি থেকে চলে আসি। এখন রাতে মেয়ে কি আত্মহত্যা করল, নাকি তাকে মেরে ফেলা হল- কিছুই বুঝতে পারছি না।

৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে বিয়ে বিচ্ছেদের রায়ে দেয়ার প্রশ্নই আসে না বলেও দাবি করেন তিনি।

Recent Posts

Leave a Comment