ছুটির সময় আরেকটু সামাজিক
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নওরীন আয়েশা। ঈদ মানেই তাঁর কাছে অবসর আর ছুটি উপভোগের উপলক্ষ। আর? প্রশ্ন করতেই তাঁর উত্তর, ফেসবুকে ছবি দেওয়া, চেক-ইন করাটাও এখন ঈদের দিনের বেশ একটি কাজ হয়ে পড়েছে। ঈদের আনন্দের আঁচটা কিন্তু ফেসবুক প্রোফাইলে ছড়াতেই হয় এখন।
ঈদ উৎসবে অবসরের অনেকটা সময়ই ফেসবুকের নীল দেয়ালে ঘুরেফিরে কাটাই আমরা। নিজের ছবি-আনন্দ ভাগাভাগির অন্যতম মাধ্যম এখন ফেসবুক। ফেসবুকে ভর করে কিন্তু ছুটির সময়টাও আটকা পড়ে যাচ্ছে মুঠোফোনের পর্দায়। মুঠোফোনে কারণে-অকারণে সময় কাটানোর ফলে আসলে কি আমাদের ক্ষতিই হচ্ছে না?
ছুটিতে ফেসবুকে সময় না কাটিয়ে বইও পড়তে পারেন। মডেল: আলভি। ছবি: অধুনাঅন্য দুনিয়ার খোঁজ রাখছি তো?
ফেসবুক কিংবা মুঠোফোন তো অনেক বড় দুনিয়ার খোঁজ দেয় আমাদের। কিন্তু ঈদের ছুটিতে কি বইপড়া কিংবা বিভিন্ন পত্রিকার ঈদসংখ্যার লেখা কি পড়ছি আমরা? বই নাকি মনের দুনিয়াকে বড় করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম আলী আশরাফ জানান, যেকোনো ছুটির দিনই কিন্তু বই পড়ার দারুণ একটি সুযোগ তৈরি করে। ঈদের ছুটিতে বই পড়ার জন্য কাজে লাগাতে পারেন। বই আমার-আপনার মন আর মনন রঙিন করে।
গল্পের বাক্সরা কি হারিয়ে যাচ্ছে?
এই তো ফেসবুক-মুঠোফোন আসার আগে যেকোনো আড্ডায় গল্পের বাক্স নিয়ে হাজির হতাম আমরা। কারণে-অকারণে গল্প, আষাঢ়ে গল্প থাকত আমাদের আড্ডায়। সেসব হারিয়ে যাচ্ছে না তো আপনার জীবন থেকে? বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা অতিথি হয়ে কারও বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই কি ‘ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট সংযোগের পাসওয়ার্ড চেয়ে বসেন আপনি? তরুণ পেশাজীবী প্রমি নাহিদ জানান, ঈদের ছুটিতে যে আড্ডার সময়টা পাই, সেখানে ওয়াই-ফাই সংযোগ যেন আড্ডার আবহকে নষ্ট করে দেয় এখন। আগের সেই গল্প, সেই টান হারিয়ে ফেলছি বোধ হয় আমরা।
আপনজনদের খোঁজ নিচ্ছি কি?
ঈদের ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে বাড়িতেই থাকেন ব্যাংকার আজহারুল ইসলাম। অতিথি আপ্যায়ন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো আর নিত্য অনুষঙ্গ ফেসবুক-মুঠোফোনেই দিন চলে যায় তাঁর। আজহার বলেন, কেমন যেন একটা লোক দেখানো খোঁজখবর নিই আমরা। ফেসবুক কিংবা মুঠোফোনে খোঁজ নিয়েই এখন তৃপ্ত থাকি। আগে ঈদ মানে ছিল দূরের কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বিকেল গড়িয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত থেকে যাওয়া। এখন কি তা করার নেশা আছে? নেশা তো সবার এখন মুঠোফোনে মাথা গুঁজে রাখা!
আসলে কাকে এড়িয়ে যাচ্ছি আমরা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর সহকারী অধ্যাপক ইফতেখারুল আমিন বলেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। ‘ঈদের ছুটিটা নিজের মতো করেই সাজাই। একটা সময় ছিল যখন আমাদের ব্যস্ততা কম ছিল, প্রত্যাশা কম ছিল। এখন কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। সারা বছরের ব্যস্ততাকে কাটিয়ে ঈদের সময়টাকে একটু একাকীই কাটাতে চাই। সে কারণেই কিন্তু অন্যদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা থাকে আমাদের। এ ক্ষেত্রে একাকিত্বে মুঠোফোন আর ফেসবুকই আমাদের বন্ধু হয়ে উঠছে।
সিনেমার পর্দায় জীবন দেখছি কি আমরা?
এখন তো মুঠোফোনের চার কোণের পর্দায় সবই দেখা যায়। দুই যুগ আগেও টেলিভিশনই ছিল আমাদের রঙিন দুনিয়ার জানালা। সিনেমা ছিল তখন বড় পর্দা! এখন কি আর বড় পর্দা কিংবা টেলিভিশন কি আমাদের টানে? সবাই নিজ নিজ মুঠোফোন নিয়ে আলাদা দুনিয়ায় চোখ রাখছেন। ঈদের ছুটিতে নিজের কন্যাকে নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে ভীষণ পছন্দ করেন ফারহানা হক। ‘আমার মেয়ের বয়স চার হলেও গেল কয়েক বছর ওকেসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিনেমা হলে যাই। মুঠোফোনের বিনোদন কিন্তু একার বিনোদন। আর সিনেমা হলের বড় পর্দার বিনোদন কিন্তু সবাইকে নিয়ে।’ বলেন তিনি। হইচই করে বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিবারের সদস্যদের সিনেমা হলে ঈদের ছুটিতে বড় পর্দায় জীবন খুঁজে দেখতে যেতে পারেন।
খেয়াল রাখুন
* যেকোনো আড্ডায় মুঠোফোন দূরে রাখুন। মুঠোফোনে মাথা গুঁজে হারিয়ে ফেলা কিন্তু বোকামি।
* পারিবারিক আড্ডায় ছবি তোলায় বেশি সময় নষ্ট করবেন না।
* কারও বাড়িতে ঘুরতে গেলে ছবি তোলা, ফেসবুকে চেক-ইন কিংবা কাউকে ট্যাগ করার ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও গোপনীয়তা খেয়াল রাখুন।
* সন্তান ও বাড়ির ছোটদের ঈদের সময় বইপড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলুন।
* বাড়ির ড্রয়িংরুমকে ছোট সিনেমা হল বানিয়ে সবাইকে নিয়ে সিনেমা দেখতে পারেন।
* কোথায় ঘুরতে গেলে ইচ্ছে করেই মুঠোফোনকে সাময়িক নিষ্ক্রিয় করে একান্ত সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।